ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার নিয়ে মতবিনিময়

বৈষম্যহীন, নিপীড়নমুক্ত ও মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হবে

  • ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করতে হবে, ছাত্র সংসদ সচল করতে হবে
  • ফলাফল ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রথম বর্ষ থেকেই আবাসিক হলে সিট বরাদ্দ দিতে হবে
  • গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে
  • একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটির বেশি পদে থাকতে পারবেন না
  • উপাচার্যের কর্মপরিধি কমিয়ে অন্যদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২০:৫৩

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে বৈষম্যহীন ও নিপীড়নমুক্ত মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে বৈষম্যহীন ও নিপীড়নমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার' শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এ নিয়ে আলোচনা করা হয়। 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসমাজ' নামের একটি প্ল্যাটফর্ম এই সভা আয়োজন করে। এতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরাও আলোচনায় অংশ নেন।

মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন প্রস্তাব–সংবলিত মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক আবদুল্লাহ-আল মামুন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক খোরশেদ আলম এবং থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজের শিক্ষক শাহমান মৈশান।

তারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় একজন শিক্ষার্থীর অনেক স্বপ্ন থাকে। কিন্তু ভর্তি হতে না হতেই সেই শিক্ষার্থী হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ, আবাসিক হলে একটি সিট পাওয়ার জন্য তাকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে যোগ দিতে হয়। মেরুদণ্ড বিকিয়ে দিতে হয়। এভাবে একে একে তার স্বপ্নগুলো মরতে থাকে। বহুকাল ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন হয়ে আসছে।

এ প্রসঙ্গে তারা আরও বলেন, এখনকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে একটি বৈষম্যহীন ও নিপীড়নমুক্ত মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হবে। গেস্টরুম সংস্কৃতির নামে শিক্ষার্থীদের যে নির্যাতন করা হয়, কিংবা গণরুম সংস্কৃতির নামে যে গাদাগাদি করে অমানবিক পরিবেশে থাকতে হয়, তা বন্ধ করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করে ছাত্র সংসদ সচল করতে হবে। শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কমাতে হবে উপাচার্যের ক্ষমতা।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক খোরশেদ আলম প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, 'গেস্টরুম ও গণরুম কালচার জাদুঘরে পাঠাতে চাই।' জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক আবদুল্লাহ-আল মামুন বলেন, 'শিক্ষা খাতে বাজেট না বাড়ালে বৈষম্য দূর হবে না।' নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন বলেন, 'অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই ঐতিহাসিক কালপর্ব বহুমুখী সুযোগ এনে দিয়েছে। চলুন, এই সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে নিজেদের পরিবেশ-প্রতিবেশ-প্রতিষ্ঠানকে অধিকতর গণতান্ত্রিক, গণবান্ধব ও কার্যকর করে করে তুলি।'

চার শিক্ষকের উপস্থাপন করা মূল প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কতগুলো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক ও পেশিশক্তিনির্ভর ছাত্ররাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা; বিতর্ক, সমালোচনা, প্রশ্ন যদি যৌক্তিক কারণে সরকার, রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠিত ভাবাদর্শকে সমালোচনা করে, তবে সেই গঠনমূলক জ্ঞানচর্চাকে রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেওয়া; শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিপীড়ন ও হয়রানি বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিপীড়ন-বৈষম্যবিরোধী সেল’ গঠন; আচরণবিধিমালা প্রণয়ন; বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিশ্ব স্বীকৃতি মানসম্মত অনুপাত ১: ২০ হলেও বিদ্যমান বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ১: ৪০–এর বেশি না হওয়ার ব্যবস্থা করা; ‘টিচিং ইউনিভার্সিটির (শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়) পরিবর্তে টিচিং অ্যান্ড রিসার্চ (শিক্ষা ও গবেষণা)’, এই মিশ্র বৈশিষ্ট্যের বিশ্ববিদ্যালয় করা; মেধা ও আর্থসামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করে প্রথম বর্ষ থেকেই আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ; পিএইচডি প্রোগ্রামে পরিবর্তন আনা; শিক্ষকদের পদোন্নতিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা যুক্ত করা এবং ঢাকার বড় সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে ছেড়ে দেওয়া।

শিক্ষকদের প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটির বেশি পদে (সিন্ডিকেট, সিনেট, ডিন, প্রভোস্ট ইত্যাদি) থাকতে পারবেন না, শিক্ষক সমিতির পদে থাকা কোনো শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় বা রাষ্ট্রের কোনো প্রশাসনিক পদ গ্রহণ করতে পারবেন না, নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা ও শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে উপাচার্যের কর্মপরিধি কমিয়ে তা অন্যদের মধ্যে বণ্টন করা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার চর্চা ও দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত করা; ছুটি, সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট ইত্যাদি কাজ সহজ ও স্বচ্ছ করার প্রস্তাব করা হয় মূল প্রবন্ধে।

আলোচনার এক পর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব একটি একাডেমিক বিশ্ববিদ্যালয় রূপে পরিণত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ কাজ করছে। এ উদ্যোগে আরও বেশি ছাত্র-শিক্ষককে যুক্ত করা জরুরি। সবাইকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জায়গা তৈরি করা জরুরি।'

আরেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের বলেন, 'আমার সামনে একঝাঁক তরুণ বসে আছেন, যাঁরা অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বিনিময়ে কী পেয়েছি, শুধু হতাশা আর হতাশা। একটি অজপাড়া গাঁ থেকে আলাভোলা একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, তাঁরা দুই থেকে তিন মাস পর, যাঁরা আবাসিক হলে উঠেন তাঁদের মধ্যে পরিবর্তন আসে।... যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, হলে আসন পাওয়ার জন্য নিজের স্বকীয়তা–মেরুদণ্ড সবকিছু বিকিয়ে দিতে হয়। রাজনীতি করা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু হলগুলোতে সেই দখলদারত্বের রাজনীতি থাকবে না। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ক্যাম্পাসে থাকবে না।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, 'যে বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে চেয়েছি, তা হয়নি। এটা আমার দুঃখ। রাজনীতি করা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু হলগুলোতে সেই দখলদারত্বের রাজনীতি থাকবে না। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ক্যাম্পাসে থাকবে না।'

উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের প্রস্তাবগুলোর কিছু মতামত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় চূড়ান্ত বিচারে সমাজের প্রতিষ্ঠান। এখানে সবার সমান অধিকার রয়েছে। ফলে তারা যেভাবে চাইবে, সেভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় চলবে। প্রতিষ্ঠানকে জ্ঞান নির্ভর ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।, এ সময় প্রস্তাবের খসড়া জমা দেওয়ারও অনুরোধ করেন উপাচার্য।'

দীর্ঘদিন ধরে অচল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবে নাগাদ চালু হতে পারে, তা জানিয়ে উপাচার্য বলেন, চলতি মাসের শেষের দিকে বা তার একটু আগে সিন্ডিকেটের অনুমোদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হবে।

মতবিনিময় সভার সভাপতির বক্তব্যে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, 'চিন্তাকে চিন্তা দিয়ে, বইকে বই দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। বইকে বুলেট নয়, চিন্তাকে চাপাতি দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না।' এছাড়া বিশাল জায়গাজুড়ে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলো ভেঙে দেওয়া বা জাদুঘরে রূপান্তর করার দাবি জানান অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

ইত্তেফাক/আরএস