স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশায় দিন গুনছেন তারা। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) গিয়ে দেখা যায়, তাদের কেউ শুয়ে আছেন, কেউ ক্র্যাচে ভর করে হাঁটছেন। কেউ আবার স্বজনের কাঁধে ভর করে হাঁটার চেষ্টা করছেন। কারো হারিয়েছে হাত, কারো পা। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার রয়েছে শঙ্কা। দীর্ঘ ৪০/৪৫ দিনের বেশি সময় কাটছে তাদের হাসপাতালের বিছানায়। এত সময় একসঙ্গে থাকতে থাকতে, তাদের একে অপরের মধ্যে গড়ে উঠেছে সখ্য।
পঙ্গু হাসপাতালের তৃতীয় তলা। ‘বি-ওয়ার্ড’ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত রোগীদের জন্য বিশেষায়িত এই ওয়ার্ড। প্রবেশ করতেই দেখা যায়, বাবা-মায়ের কাঁধে ভর করে হাঁটার চেষ্টা করছেন আব্দুল্লাহ আহমেদ। ঢাকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। আন্দোলনে ডান পায়ে গুলি লাগে তার। একাধিক অস্ত্রোপচারের পর ডান পা ফুলে অস্বাভাবিক ভারী হয়ে আছে। পা জুড়ে লাগানো আছে স্টিলের রিং। এই রিং পরেই থাকতে হবে আনুমানিক এক বছর। মা বিলকিস বেগম জানান, চিকিৎসক বলেছেন, হাঁটতে পারলেও হাঁটু থেকে পা আগের মতো ভাঁজ করতে পারবে না। আব্দুল্লার ইচ্ছা ছিল, আর্মি অফিসার হবে। কিন্তু এখন এইচএসসি পাশ করে একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট পড়তে চান। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরাই তার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান।
পাশেই বি-৪২ নম্বর বিছানায় বসে আছে ১৯ বছরের সাদ আব্দুল্লাহ। অস্ত্রোপচারে ডান পায়ের গুলি বের হয়েছে, তারও পুরো পা জুড়েই স্টিলের রিং দিয়ে বাঁধানো। সাদ বলেন, চিকিৎসক জানিয়েছেন, আমার পায়ের এই রিং খুলতে সময় লাগবে এক বছর। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে সাদ ও তার পরিবারের সদস্যরা।
আসলাম হোসেন, বয়স ২৩। তার হাতে ছর্রার গুলি লাগে ৭৫ টি। বিকম ২য় বর্ষের ছাত্র তিনি। জানান, তার পায়ের থাইয়ের মাংস ও পেটের স্কিন কেটে হাতে লাগানো হয়েছে। এখন পা, পেট ও হাতের যন্ত্রণায় দিন কাটছে। কিশোরগঞ্জ খান কলেজের ছাত্র রেজওয়ান আহমেদ, বয়স ২১ বছর। বলেন, ‘আমাকে ধরে নিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করেছে। সব আঘাত ভালো হয়েছে। তবে হাতের লিগাম্যান্ট ছিঁড়ে গেছে। এখন হাতে জোর পাই না। অপারেশন হবে হয়তো সামনের সপ্তাহে।
বি-৩৭ নম্বর বিছানায় বসে ভাত খাচ্ছিল আলি হাসান-১৬। দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয় ৫ আগস্ট সাতক্ষীরায়। সেখান থেকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে এলে চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করেও আলি হাসানের ডান পা রাখতে পারেন নাই। ১৪ আগস্ট তার পা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত কেটে বাদ দেওয়া হয়। এরপর ৩০ আগস্ট এই কিশোর বাড়ি ফিরে যায় ক্র্যাচ নিয়ে। বাড়িতে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যায় এবং কাটা পায়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, তখন আবার তারা ১৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে আসে। এখনো ক্র্যাচে অভ্যস্ত হতে পারেনি বলে জানান সঙ্গে থাকা মামা।
তবে প্রাণবন্ত দেখা যায়, ডান হাত কেটে বাদ দেওয়া আতিকুল ইসলামকে। ১৯ বছরের এই যুবক বলেন, ‘যখন আন্দোলনে গিয়েছি, তখন ভেবেছি, ‘প্রাণ গেলেও স্বাধীনতা আনবো, দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার প্রাণ তো যায়নি, গেছে কেবল একটা হাত। প্রয়োজনে তো জীবন দিতেও প্রস্তত ছিলাম, তাই কোনো আক্ষেপ নাই। হাত হারানোর জন্যে খারাপ তো লাগেই। তবে এখন আর ওসব মনে করতে চাই না।
কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক জানান, একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম সময় লাগবে। তবে তারা সবাই মোটামুটি ভালোর দিকে। অনেককেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক শামীমুজ্জামান বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিতে আহত ৭৬৮ জনকে ভর্তি করা হয় এই হাসপাতালে। তাদের মধ্যে ২১ জনের অঙ্গহানি হয়েছে। এখন যারা আছেন তাদের অবস্থা ভালোর দিকে। তাদের পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে। তাদের শরীরে ডিভাইসগুলো লাগিয়েছি, এখন তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এটা ঠিক বলা যাচ্ছে না যে, কতদিন সময় লাগবে। তবে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে।
