পদ্মার আগ্রাসনে গৃহহীন পাইনপাড়া চরের দুই শতাধিক পরিবার

  • গত ১০-১২ দিনে বেড়েছে ভাঙনের তীব্রতা

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১৬:৪০

পদ্মার ভাঙনে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের চতুর্দিকে পদ্মা বেষ্টিত পাইনপাড়া চর। দীর্ঘ দুই মাসব্যাপী ভাঙনে আতঙ্কে দুই শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন পদ্মা সেতুর জিরো পয়েন্ট থেকে ৪০০ মিটার দূরে খোলা মাঠে। কেউ কেউ ঘর তুলতে পারলেও অনেকেই এখনো খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভাঙা চালের মধ্যেই বসবাস করছেন। উপজেলা প্রশাসন জরুরী ত্রাণ সহায়তা দিলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ ভাঙন কবলিতদের। ভাঙন ঝুঁকিতে আছে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও মক্তবসহ দুই শতাধিক বসতবাড়ি এবং প্রায় ৬শ’ হেক্টর আবাদি জমি। শীত মৌসুমে চরের পাশের পদ্মা থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকে  ভাঙনের কারণ হিসেবে মনে করছেন স্থানীয়রা।
 
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দুই মাস আগে থেকেই পাইনপাড়া চরে ভাঙন শুরু হয়েছে। তবে পদ্মার পানি কমতে থাকায় গত ১০-১২ দিন থেকে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্তরা। দ্রুত ভাঙন রোধে জরুরী পদক্ষেপ ও স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

পাইনপাড়া আলমখার কান্দি গ্রামের আব্বাস মোড়ল (৬৫) বলেন, শীতের সময়ে পাইনপাড়া চরের চতুর্দিক থেকে রাতের অন্ধকারে ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে গত দুই বছর ধরে আমাদের এই চরে ভাঙন শুরু হয়েছে। এবার আগস্ট মাসের প্রথম থেকেই ভাঙন শুরু হলেও গত ১০-১২ দিন যাবত ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এতদিন নিজের ভিটেমাটিতে ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করে আসছিলাম। কিন্তু আজ কালের মধ্যে যদি বাড়ি-ঘর না সরিয়ে নেই তাহলে পদ্মায় পুরোটাই গ্রাস করবে। এখন পদ্মা সেতুর পূর্ব দিকে মাঝিরঘাটের পশ্চিমে খোলা জায়গায় গিয়ে অস্থায়ীভাবে থাকব। ভাঙনের কবলে পড়ে আমরা অনেক পরিবারই এখন নিঃস্ব ও ভূমিহীন। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া আমাদের পরিবারগুলোর জন্য যদি সরকার একটা জায়গার ব্যবস্থা করে দিত তাহলে আমরা অন্তত মাথা গোজার ঠাঁই পেতাম। 

চরে এখনো বসবাসকারী একই গ্রামের আলমগীর মাদবর (৫৭) বলেন, ২০-২৫ বছর আগে এই চরটি জেগে ওঠার পর থেকেই আমরা এখানে বসবাস করতে শুরু করি। বর্ষায় পদ্মার ভাঙনের সঙ্গে আমরা পরিচিত হলেও এই চরে বসবাস করতে এসে এখন অসহায় হয়ে পরেছি। এই চরের চতুর্দিকেই পদ্মা নদী। বর্ষাকাল আসলেই ভাঙন আতঙ্কে আমাদের দিন কাটে। 

পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আলতাফ হোসেন খান বলেন, ৮৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে পাইনপাড়া চরটি জেগে ওঠার পর থেকেই সাড়ে চার শতাধিক পরিবার বসতি গড়ে তোলে। এই চরের দুইটি গ্রাম আলমখার কান্দি ও আহমদ মাঝি কান্দি। ইতিমধ্যে দুই বছরের ভাঙনে দুই শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে ঠাঁই নিয়েছে অন্যত্র। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি মাদ্রাসা (মক্তব) ও মসজিদসহ আড়াই শতাধিক পরিবার। যদি স্থায়ী ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে কালক্রমে পুরো চরটিই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। তাই এই চরটি রক্ষায় সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি জরুরী ভিত্তিতে স্থায়ী ভাঙন রোধের ব্যবস্থা গ্রহণের।
  
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দেওয়ান রকিবুল হাসান বলেন, প্রতি বর্ষায়ই আমরা ভাঙন রোধে জরুরী ব্যবস্থা হিসেবে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে থাকি। ইতিমধ্যে পদ্মার মাঝখানে অবস্থিত পাইনপাড়া চরে বিগত দুই বছরে আমরা ৩০ হাজারেরও বেশি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করেছি। ভাঙন কবলিতদের দাবি অনুযায়ী চরটি রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পেশ করব। 

জাজিরার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া ইসলাম বলেন, পাইনপাড়া চরের ভাঙন কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত দুইশ পরিবারকে আমরা ইতিমধ্যে জরুরী সহায়তা প্রদান করেছি। পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাছাড়া পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে আমরা কঠোর অভিযান পরিচালনাসহ সতর্ক নজরদারি করছি। 

ইত্তেফাক/এসএএস