আরফা জামান জান্নাতি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ১০ নম্বর আগরদাড়ী ইউনিয়নের আগরদাড়ী গ্রামের মো. কামরুজ্জামানের মেয়ে। আবাদেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরফা ২০২০ সালে করোনাকালে নিজের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করে। তার পরিবারকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, এই বয়সে বিবাহ না করে তার একটা কিছু হতে হবে। পড়াশোনাও করছে ভালোভাবে। তবে মাসিকের সময় তার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হয় ও জরায়ুর মুখে জ্বালাপোড়া করে। তার বাবা-মা জানায়, আরফা বাড়িতে প্রচণ্ড জেদ করে। কারো কথা শুনতে চায় না।
সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ফিংড়ী, আগরদাড়ী ও আলিপুর ইউনিয়ন, শ্যামনগর উপজেলার বুড়ি গোয়ালিনীর নীল ডুমুর গ্রাম, পইকখালীর সাহেবখালী ঘুরে দেখা গেল উপকূলীয় এই অঞ্চলের কিশোরীরা আরফার মতো বাল্যবিবাহ ও লবণাক্ততার কারণে প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রমের কারণে কোথাও কোথাও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি নেই তাদের। এমনকি এই এলাকার ৩৫-৪৫ বছর বয়সের নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের ১০-১২ বছর বা পাঁচ বছর আগেও তেমন যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল না।
এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ৩০ সেপ্টেম্বর ‘কন্যাশিশুর স্বপ্নে গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস।
পাঁচ জনের পাঁচ জনই প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে
আগরদাড়ী গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মোসাম্মত খাদিজা খাতুন, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিহা সুলতানা রত্না, উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া সাদিয়া আফরিন জবা, ষষ্ঠ শ্রেণির সানিয়া খাতুন, নীলডুমুর গ্রাম ও বুড়ি গোয়ালিনী ইউনিয়নের ষষ্ঠ শ্রেণির মোসাম্মত্ লিমা খাতুন ও একই শ্রেণির আসিয়া খাতুনের সঙ্গে কথা হলে তারা সবাই বলে, মাসিকের সময় তারা স্কুলে যান না।
এই এলাকায় শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স। প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নারী ও কিশোরীদের একটা বড় অংশ চিংড়িঘেরে কাজ করে। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত লবণাক্ত পানিতে থাকে। ফলে তাদের জরায়ুর সমস্যা দেখা দেয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে তারা পানির অভাবে দূর থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করে। এ সময় পানি কম খায়, পরিচ্ছন্নতার জন্য লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে।
গবেষণায় যা পাওয়া গেল
উপকূলীয় এলাকায় অল্পবয়সেই প্রজনন ক্ষমতা হারানো, গর্ভপাত, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি আর অপরিণত শিশু জন্ম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তথ্য উঠে আসে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের গবেষণায়। এতে দেখা যায়, উপকূলীয় নারী ও কিশোরীরা পানিবাহিত ও চর্মরোগে ভুগছে। মিষ্টি পানির জন্য বর্ষা আসা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষা এলে তাদের মিষ্টি পানি ধরে রাখতে হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সোমা দত্ত ইত্তেফাককে জানান, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, বাগেরহাটের মোংলা, ভোলার বোরহানউদ্দিন, বরগুনার পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় দুই গ্রুপে ১০ থেকে ১৫ বছর এবং ১৬-৫৫ বছরের নারীদের লবণাক্ততার প্রভাবে যৌন-প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে করা গবেষণার ফলাফল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, লবণাক্ততা দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে কিশোরী ও নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যা। এর ফলে এসব নারীর তাদের স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে না। ফলে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন বাড়ছে, সংসারও ভাঙছে।
বিজ্ঞজনেরা যা বলেন
সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজের প্রসূতি ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. কানিজ ফাতেমা ইত্তেফাককে বলেন, এই এলাকার নারীদের মধ্যে সাইকো-সোশ্যাল কারণে জরায়ু কেটে ফেলার প্রবণতা বেশি। জরায়ুর ইনফেকশন দেখা দিলে তারা ভাবেন ক্যানসার হবে। তাই তারা জরায়ু কেটে ফেলাকেই উত্তম মনে করেন।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. আ. সালাম বলেন, এলাকার নারী ও কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা দৃশ্যমান। তবে তা লবণাক্ততার জন্য কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ও ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জমান বলেন, একটি গবেষণায় দেখেছি, শুষ্ক মৌসুমে সাতক্ষীরার বেশির ভাগ নারী ও কিশোরী লবণাক্ততার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেয়ে মাসিক চক্র বন্ধ রাখে। দিনের পর দিন মাসিক বন্ধ রাখায় প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে। তাছাড়া প্রজনন অঙ্গে লবণপানি ব্যবহার করলে চর্ম রোগ হয়। সেই এলাকায় বাঁধ নির্মাণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির জন্য বাঁধগুলো টেকসই হয় না। চিংড়ি চাষে লাভের জন্য প্রভাবশালীরা লবণপানি চান। আবার বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি থাকে। তবে দিনের পর দিন মানুষ ভুক্তভোগী হতে পারে না। বর্তমান সময়ে লবণাক্ততা প্রতিরোধে বিকল্প প্রযুক্তি আছে, যার ব্যবস্থাপনা জরুরি।

