হত্যা মামলায় সমন্বয়হীনতা

  • এক হত্যায় একাধিক মামলা
  • বাদী না চাইলেও বেড়ে যাচ্ছে মামলার আসামি
আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৪, ১৮:৪২

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। একই হত্যার ঘটনায় একাধিক মামলা যেমন হয়েছে, তেমনি বাদী না চাইতেই বেড়ে যাচ্ছে মামলার আসামির সংখ্যা। এসব মামলায় আসামি গ্রেপ্তারের নামে হয়রানির অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তের আগে কাউকে হয়রানি করা হবে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার তালেবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এসব মামলায় কাউকে হয়রানির সুযোগ নেই। তদন্ত না করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কেউ যদি ভুয়া বা হয়রানি করতে মামলা করেন তাহলে বাদীর বিরুদ্ধেও আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত ৪ অক্টোবর রাজধানীর ঝিগাতলা মোড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মোবেশ্বর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল মোতালিব (১৪)। এই ঘটনায় গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন মোতালিবের বাবা আব্দুল মতিন। এই ঘটনায় ৩০ আগষ্ট আদালতে একটি মামলার অভিযোগ দেন শেখ মুহা. মাছুম বিল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। মামলাটি হাজারীবাগ থানায় হত্যা মামলা হিসেবে দায়ের করার নির্দেশ দেন আদালত। মাছুম বিল্লাহ ভিকটিমের নাম উল্লেখ করেন আব্দুল মোতালেব মুন্না। তার বয়স উল্লেখ করেন ১২ বছর। বাদীর সঙ্গে ভিকটিমের কোনো সম্পর্ক নেই। শিক্ষার্থী মোতালিবের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায়। আর মাছুম বিল্লাহর বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরে।

আব্দুল মতিন এজাহারে ১৭৭ জন আসামির নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে মাছুম বিল্লাহ যে অভিযোগ দিয়েছেন সেখানে আসামি করেছেন ২০ জনকে। এদের কারও বাসা ঐ এলাকায় নয়, আবার অধিকাংশই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। আসামিদের মধ্যে পুলিশ ইতিমধ্যে তিন জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডেও নিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান দখলে নেওয়ার জন্য এই মামলা বলে আসামিদের অভিযোগ।

নিহত শিক্ষার্থীর বাবা আব্দুল মতিন ইত্তেফাককে বলেন, ছেলে হত্যার ঘটনায় আমি নিজে মামলা করেছি। অন্য কেউ কেন মামলা করবে? আমি ঐ ব্যক্তিকে চিনি না। তিনি নিশ্চয় ভালো উদ্দেশ্যে এই মামলা করেননি। হাজারীবাগ থানার ওসি ফোন করে আমাকে জানিয়েছেন মামলার কথা। আমি তার সঙ্গে দেখা করব।

হাজারীবাগ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আদালতের নির্দেশে আমরা মামলাটি নিয়েছি। আমরা আগে জানতাম না এই ঘটনায় আগে মামলা হয়েছে। আমরা ভিকটিমের বাবাকে ডেকেছি, তার সঙ্গে আলোচনা করে আদালতে জানাব। আদালত যেভাবে নির্দেশনা দেবেন সেভাবেই আমরা এ ব্যাপারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব। ডিবি এই মামলায় দুই জনকে গ্রেপ্তার করে আমাদের দিয়েছে।

এই বিষয়টি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে রমনা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনারকে। তিনি ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছেন।

মামলার এজাহারে মাছুম বিল্লাহ যে ফোন নম্বর দিয়েছেন, সেটা কয়েক দিন ধরে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি হাজারীবাগের মনেশ্বর রোডে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেই ঠিকানায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে কি উদ্দেশ্যে তিনি এই মামলা করেছেন সেটা জানা যায়নি। তবে তার মামলার অভিযুক্ত একজন জানিয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠান দখলের জন্য তিনি মামলা করেছিলেন সেই প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তারা দখল করে নিয়েছেন। যারা ঐ প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছিলেন পুলিশ তাদের তিন জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়ায় কেউ বাধা দেয়নি।

অন্যদিকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গত ৫ আগস্ট নিহত হন পিকআপ চালক মো. শাহীন। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তার স্ত্রী স্বপ্না বেগম। মামলায় ৮৭ জনের নাম উল্লেখ অজ্ঞাত আরও ২ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। অথচ স্বপ্না বেগম ইত্তেফাককে বলেন, আমি মামলায় মাত্র চার জনকে আসামি করেছিলাম। কিন্তু এত মানুষের নাম কীভাবে মামলায় যুক্ত হলো সেটা আমি জানি না। পুলিশ আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করেনি।

ইতিমধ্যে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে তিন বার। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছেন এসআই মোস্তফা কামাল। তিনি জানান, বারবার চেষ্টা করেও তিনি বাদীকে খুঁজে পাননি। এজাহারে দেওয়া তার ফোন নম্বরটিও ঠিক নেই। ফলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি।

এই মামলায় ১৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে হাসিব আলমকে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বসবাস করেন। তিনি জানান, বরিশালের বাউফল কেন্দ্রিক কেউ হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মামলার সঙ্গে তার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে।

ইত্তেফাক/এএম