বন্যায় ঠিকানাহীন বুড়িচংয়ের হাজারো পরিবার

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৫১

এবারের ভয়াবহ বন্যায় কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১৪ উপজেলার মোট ৮২ হাজার ৭৫৫টি ঘরবাড়ি আংশিক ও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে জেলার বুড়িচং উপজেলার ১৬ হাজার ৪৮৮টি ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় তছনছ হয়ে গেছে এ উপজেলার বহু মানুষের আশ্রয়ের ঠিকানা। 

অনেকের বাড়িঘর বানের পানির স্রোতে ভেসে গেছে, ঘরের স্থানে সৃষ্টি হয়ে আছে বড় গর্ত। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে কষ্টে দিন কাটছে বন্যাদুর্গত এসব এলাকার হাজারো পরিবারের। ঘরদুয়ার তৈরি করার সামর্থ্য হারিয়েছে অনেকে। এমন অনেক পরিবারের ঠাঁই হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। এরই মধ্যে কেউ কেউ সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন বেসরকারি কিছু সহায়তা পেলেও এখনো সরকারি বরাদ্দ পায়নি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় ও কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

ছবি: সংগৃহীত

জানা গেছে, গত ২২ আগস্ট রাতে বুড়িচং উপজেলার বুরবুড়িয়া গ্রাম দিয়ে গোমতীর বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যার তাণ্ডবে উপজেলার প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক ও সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঐ উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের বুরবুড়িয়া, বেড়াজাল, মহিষমারা, ইন্দ্রবতি, খাড়াতাইয়া, নানুয়ার বাজারসহ আশপাশের এলাকা। এসব এলাকার অসহায় মানুষজন বন্যার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। 

সরেজমিনে বুড়িচং উপজেলা: 
বন্যার ক্ষত নিয়ে রাস্তায় ঠাঁই হওয়া বুরবুড়িয়া গ্রামের তাহমিনা বেগম জানান, 'গাঙের ভাঙনের পরে পানিতে ঘরদুয়ার সব ভাসাইয়া নিছে। রাস্তার ওপর খোলা আকাশের নিচে থাকছি। রোদ-ঝড়বৃষ্টি, মশার কামড় সব সহ্য করতে হচ্ছে। কোনো উপায় নাই। ঘরদুয়ার করার আর সামর্থ্য নাই।' 

একই গ্রামের দিনমজুর দুলাল মিয়ার স্ত্রী শিউলি বেগম জানান, 'গোমতীর আঁইল (বাঁধ) যখন ভেঙে যায় তখন ট্রেনের মতো একটা শব্দ হইছে, কোনোরকমে ছেলেমেয়ে নিয়া একটা দৌড় দিয়া বাঁধের ওপর গিয়া উঠি। চোহের (চোখ) সামনে ঘরদুয়ার সব ভাইস্যা গেছে। এখন ঠিকমতো পোলাপাইনেরে খাওয়াইতে পারি না, নতুন ঘর করার টাকা-পয়সা নাই।' এভাবেই দুর্দশার কথা তুলে ধরেন তিনি। 

ছবি: সংগৃহীত

একই কথা বলেন সেখানকার সজীব মিয়া নামের এক যুবক। ভেঙে যাওয়া বাঁধের মুখেই ছিল তাদের ঘর। সজীব জানালেন, ঘরের একটা পেরেকও খুঁজে পাইনি, বন্যায় কেড়ে নিয়েছে। ঘরের স্থানটি দেখিয়ে বলেন, ঘরের জায়গায় এখন বিশাল গর্ত। ঘর তৈরিতে কোনো সহায়তা পাননি বলেও তিনি জানান। 

ঐ গ্রামের আনিসুর রহমানের স্ত্রী রোজিনা আক্তার বলেন, 'আমার স্বামী ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। বন্যায় ঘরের আসবাবপত্রসহ সব ভেসে গেছে। এক বেলা খাবার খাইলে আরেক বেলা উপোষ থাকতে হয়। টাকার অভাবে ঘর তুলতে পারছেন না।'

তাদের প্রতিবেশী পত্রিকার হকার প্রতিবন্ধী হারুন মিয়া বলেন, 'হার্টের সমস্যার কারণে প্রায় ছয় বছর যাবৎ আর হকারি করতে পারি না। বন্যার পানি সব কেড়ে নিয়েছে। কিছু দিন খাবারসহায়তা পেয়েছেন, এখন আর কিছুই পান না। 

বুরবুড়িয়া গ্রামের নিলুফার বেগমের পরিবারের ভিন্ন গল্প। তার ছেলের বউ বৃষ্টি আক্তার গত পাঁচ মাস আগে তিন শিশুসন্তান রেখে মারা যান। তাদের বাবা মো. সাব্বির অটোরিকশার চালক। সন্তানের খবরও রাখেন না। তাই দাদী নিলুফাই তাদের দেখভাল করেন। গোমতী বাঁধের পাশের একটি ঘরে তিনি থাকেন। বন্যায় নিলুফার সেই ঘরটিও ধসে গেছে। নিলুফা বলেন, শিশুদের খাবারই দিতে পারি না, ঘর মেরামতের টাকা পাব কোথায়। 

এ গ্রামের মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। বাঁধ ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে তার ঘরও ভাসিয়ে নেয় বানের পানি। অনেকে টিন ও নগদ টাকা পেলেও তিনি পাননি। 

ছবি: সংগৃহীত

একই গ্রামের আবদুল মান্নান ও ফজলুল হক বলেন, তাদের সব পানিতে ভেঙে গেছে, ঘরের জায়গায় গর্ত ভরাট করতে অনেক মাটির দরকার। তাদের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি মুখ দেখে দেখে সাহায্য দিচ্ছে, কেউ বার বার সাহায্য পাইছে, কেউ পায় না। 

বুরবুড়িয়া গ্রামজুড়ে তাহমিনা, শিউলি ও আর রোজিনাদের মতো এমনই অভিন্ন অভিযোগ আরও অনেক পরিবারের।

বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাহিদা আক্তার বলেন, 'সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন এনজিও আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্গত এলাকায় ইতিমধ্যে অনেক টিন ও অর্থসহায়তা দিয়েছেন। এমনও পরিবার আছে ৬৫ বান্ডিল করে টিন এবং সাথে টাকাও পেয়েছে।' 

ঐ কর্মকর্তার ভাষ্য, আমরা সরকারি বরাদ্দ পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যারা কম বরাদ্দ পেয়েছেন তাদের আগে অর্থসহায়তা দেওয়া হবে। সরকারি সহায়তা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত একটি পরিবারও বাদ যাবে না। 

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবেদ আলী বলেন, এবারের বন্যায় ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১৪ উপজেলার প্রায় ৮২ হাজার ৭৫৫টি ঘরবাড়ি আংশিক ও সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৮৪ কোটি ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ হাতে আসলে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মাঝে নতুন ঘর তৈরির জন্য সহায়তা দেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এসএএস