টেকসই উন্নয়নে ইন্টারনেট সহজলভ্য করা হউক

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১০:৩৪

বর্তমান যুগে ইন্টারনেট মানুষের জন্য কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নহে, বরং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফরমে পরিণত হইয়াছে। বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা দিনদিন প্রসারিত হইলেও, মোবাইল ডাটা ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম এখনো অনেকের নাগালের বাহিরে। বিশেষ করিয়া, গ্রামের জনগণ ও শিক্ষার্থীরা উচ্চমূল্যের কারণে ইন্টারনেট সেবার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা হইতে বঞ্চিত হইতেছে। ইহার ফলে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগাইয়া দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক খাত উন্নত করিবার যে সুযোগ রহিয়াছে, তাহা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হইতেছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হইতে শুরু করিয়া গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আজকাল ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস, কোর্স ও রিসোর্স সংগ্রহ করিয়া থাকে। তবে দেশের অনেক শিক্ষার্থী শুধু ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে পারিতেছে না। শুধু শিক্ষা নহে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার অভাব দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে। বর্তমান বিশ্বে ব্যবসায়-বাণিজ্য হইতে শুরু করিয়া প্রশাসনিক কার্যক্রম-সকল কিছুতেই ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাইয়াছে। অথচ, দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বেশি খরচের কারণে ইন্টারনেটের সুবিধা সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করিতে পারিতেছেন না। ইহা উৎপাদনশীলতায় একধরনের ঘাটতি তৈরি করিতেছে, যাহা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়াইতেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, যেমন শ্রীলঙ্কা ও ভারতে ইন্টারনেটের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। ভারতে প্রতি জিবি ইন্টারনেটের দাম যেইখানে মাত্র ১০-১৫ টাকা, সেইখানে বাংলাদেশে প্রায় তিন গুণ বেশি।

আরেকটি উদাহরণ-আফ্রিকার কেনিয়া। দেশটিতে মোবাইল ও ইন্টারনেট খাতে ব্যাপক সংস্কার করা হইয়াছে এবং সরকার সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করিয়াছে। এই ধরনের উদাহরণ বাংলাদেশেও প্রযোজ্য হইতে পারে, কারণ সুলভ মূল্যের ইন্টারনেট সাধারণ জনগণকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ করিয়া দেয় এবং স্থানীয় ব্যবসায়-বাণিজ্যকে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে লইয়া যাইতে সহায়তা করে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সহজলভ্য হইলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার সুবিধা লইতে পারিবে। স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিতথ্য, সরকারি সেবা গ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইন্টারনেট অত্যন্ত কার্যকর হইতে পারে। ই-গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল পেমেন্ট ও স্মার্ট গ্রাম উন্নয়নে ইহা বিশেষ ভূমিকা রাখিতে পারে। এই লক্ষ্যে ইন্টারনেটের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে।

বিশেষ করিয়া, কল রেটের সিলিং অর্থাৎ টেলিকম অপারেটরদের নির্ধারিত সীমার মাঝে কল চার্জ রাখার বাধ্যবাধকতা দীর্ঘদিন ধরিয়া টিকিয়া রহিয়াছে। এই ক্ষেত্রে এক দাম এক রেট চালু করা প্রয়োজন। প্যাকেজের ভিন্নতা ও বাধ্যবাধকতায় ইন্টারনেট অব্যবহৃত থাকিয়া যাওয়ার কারণে গ্রাহকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। ফলে ইন্টারনেটের মূল্য গ্রাহকদের উপর খরচের বোঝা বাড়াইয়াছে এবং টেলিকম কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হ্রাস করিয়াছে। সিলিং উঠাইয়া দিলে প্রতিযোগিতা বাড়িবে এবং বিভিন্ন অপারেটরের মধ্যে কম খরচে সেবা দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হইবে। এই ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন প্রযুক্তির উন্নয়নে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হইবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা না থাকিলে দেশের উন্নয়ন টিকসই হইবে না। ইহার জন্য ইন্টারনেটের মূল্য মানুষের সাধ্যের মধ্যে লইয়া আসিতে হইবে। দেশের টেলিকম খাতের উন্নয়নে সঠিক নীতি প্রয়োগের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা যাইতে পারে। আমরা যদি উন্নত বিশ্বকে অনুসরণ করিতে চাহি, তাহা হইলে আমাদের অবশ্যই ইন্টারনেটকে গ্রামগঞ্জসহ সর্বত্র প্রতিটি নাগরিকের নিকট পৌছাইয়া দিতে হইবে।

আমাদের বুঝিতে হইবে, ইন্টারনেট এখন আর বিনোদনের অংশ নহে, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের একটি মাধ্যম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাই এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করিয়া প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হইলে বাংলাদেশের জনগণও ডিজিটাল বিশ্বের অংশ হইতে পারিবে এবং দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখিতে সক্ষম হইবে।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন