বৃষ্টি এলে বাবার কবরে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ছোট্ট ফাহিম

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৪, ১৯:২৯

৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া আশরাফুল ইসলামের ছেলে ফাহিম মাহমুদ। চিরনিদ্রায় শায়িত বাবা আশরাফুল ইসলাম বৃষ্টির পানিতে বাবা ভিজে যাবেন এই ভয়ে প্রতিদিন ছাতা নিয়ে বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ফাহিম মাহমুদ প্রাণ। বাবার পুরাতন ছবি আর মোটরসাইকেল নিয়েই দিন কাটে তার।

আশরাফুল ইসলাম পেশায় রংমিস্ত্রি হলেও মানুষের অধিকার আদায়ে ছিলেন সোচ্চার। তাই জুলাই মাসের প্রারম্ভে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন। নামেন রাস্তায়। বাসায় না জানিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচার সরকার পতনের মিছিলে শামিল হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবন দিতে হলো আশরাফুলকে। স্ত্রীকে ভাত রান্না করতে বলে গিয়ে জীবিত আশরাফুল আর ফিরে এলো না বাড়ি।

চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথমদিকে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। শেখ হাসিনা সরকারের অবিবেচিত সিদ্ধান্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়াতেও আগস্ট-এর শুরু থেকেই সরকার পতনের আন্দোলন প্রকট আকার ধারণ করে।

গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটলেও দিনটির ভোর বেলা থেকেই ছাত্র জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যায় পুলিশ। কুষ্টিয়ার প্রাণকেন্দ্র এনএস রোড হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র। ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দমন করতে বুলেট, টিয়ার সেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ। শুধু ৫ আগস্টই পুলিশের প্রাণঘাতি গুলিতে নিহত হন ৯ জন। এদেরই একজন দুই সন্তানের পিতা, রংমিস্ত্রি আশরাফুল ইসলাম (৪৮)।

কুষ্টিয়া চার রাস্তার মোড়ে দুপুর ১২ টায় পুলিশের ঘাতক বুলেটের আঘাতে শহিদ হন তিনি। আশরাফুল ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুরের সালদা গ্রামের আফিল উদ্দিন এবং মোছাম্মৎ নাজমা খাতুনের ছেলে।

অনেক প্রাণের বিনিময়ে দেশ আজ স্বৈরাচার মুক্ত। কিন্তু পরিবারের একমাত্র উপার্জনসক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও সন্তানরা এখন দিশেহারা। স্ত্রী লাবনী আক্তার ইতি, ছেলে ফাহিম মাহমুদ প্রাণ (১০) ও  মেয়ে ফারিহা তাবাসসুম ফারাহকে (৪) নিয়ে আশরাফুলের যে সুখের সংসারে নেমে এসেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ঘোর অন্ধকার।

ফারিয়া তাবাসসুম ফারাহ চার বছরের শিশু। মৃত্যু কি তা বুঝে ওঠার আগেই হারিয়েছে পিতাকে। বাবার অনুপস্থিতি তাবাসসুমের ছোট্ট মনে ফেলেছে বিরূপ প্রভাব। তাইতো শিশু মন পিতার মৃত্যু পারছে না মেনে নিতে। সে কবর থেকে উঠিয়ে গুলি বের করে বাঁচিয়ে তুলতে চায় বাবাকে। সঙ্গে পিতার হত্যার সঙ্গে জড়িত পুলিশের বিচারও চায় সে।   

আশরাফুলের আয় রোজগারে কোন মতে সংসার চললেও এখন একেবারেই থমকে গেছে সব। মানুষের সাহায্যে বর্তমানে কোনরকমে চলছে তাদের সংসার। কিন্তু কতোদিন চলবে এভাবে? সেই চিন্তায় দুই সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রহর গুনছেন আশরাফুলের স্ত্রী। তবে শত কষ্টের মাঝেও স্বামী দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে শহিদ হয়েছেন এটাই তার বড় পাওয়া বলে তিনি জানিয়েছেন।

আশরাফুলের স্ত্রী লাবনী আক্তার ইতি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘গত ৪ ই আগস্ট আমার স্বামী কাউকে না জানিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যায়। আমি বাধা দেবো বলে ৫ আগস্ট আমাকে ভাত রান্না করতে বলে বাইরে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায় এসে খাবো। কিন্তু আর একসাথে খাওয়া হলো না। পুলিশ খুব কাছ থেকে গুলি করে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও পুলিশ একের পর এক লাথি মারতে থাকে। এমন একটি ভিডিও আপনারা সবাই দেখেছেন। কি অমানবিক ভাবে তাকে হত্যা করলো। আমি আমার ছেলে মেয়েদের কি করে মানুষ করবো। ওদেরকে আমি বোঝাতে পারি না। এখনও সরকারের কাছ থেকে কোন সাহায্য সহযোগিতা পাইনি।’

মেয়ে ফারিয়া তাবাসসুম  ফারাহ বলেন, ‘আমি বাবার শরীর থেকে গুলি বের করে ভালো করে তুলবো। পুলিশ কেন আমার বাবাকে গুলি করলো? এখন আমাকে কেউ কোলে নেয় না। আদর করে না। আমার বাবা আকাশের তারা হয়ে গেছে’।

আশরাফুলের ছেলে ফাহিম মাহমুদ প্রাণ বলেন,‘এখন বৃষ্টি নামবে, আব্বুর কবরের পাশে যাবো। ছাতা না নিলে ভিজে যাবে আব্বু। আমার আব্বুকে ওরা গুলি করে মেরে ফেলেছে।’

স্বজনরা জানান, ‘দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা আশরাফুলের পরিবারের জন্য সকলের এগিয়ে আসা উচিত।  এতে একটি পরিবার যেমন পাবে আলোর দিশা অন্যদিকে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা আশরাফুল বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।

ইত্তেফাক/এমএএস