১৮ বছরেও চালু হয়নি রহিমপুর পাম্প হাউজ

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:০৩

সিলেট অঞ্চলের সম্ভাবনাময় ‘আপার সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্প’টির সুফল পুরোপুরি ঘরে তোলা যাচ্ছে না। প্রকল্পের ৭৩.৯৫ ভাগ কাজ শেষ হলেও কুশিয়ারার পানি না পাওয়ায় এখনো গুরুত্বপূর্ণ ‘রহিমপুর পাম্প হাউজ’টি চালু করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে আটকে আছে এই পাম্প হাউজটি।

জানা গেছে, ২০০১-২০০২ অর্থবছরে গৃহীত এই প্রকল্পটি ২০০৫-০৬ অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় মতো অর্থ বরাদ্দসহ নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। শুধু মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতে ১১১ কোটি টাকার প্রকল্প ১৩১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ঐ সময় ‘রহিমপুর পাম্প হাউজ’ নির্মাণ সম্পন্ন হলেও এটি চালু করতে গিয়ে বাধা পড়ে। এতে সিলেটের পাঁচ উপজেলার অন্তত ১২ লাখ কৃষকের একটি বড় স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। অথচ এই পাম্প হাউজটি চালু করা গেলে সিলেটে কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতো। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ বার্ষিক বর্ধিত কৃষি উত্পাদন হতো ৮৬ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন।

কর্মকর্তারা জানান, প্রথম দিকে রহিমপুর পাম্প হাউজের সাহায্যে কুশিয়ারা নদী থেকে পানি তুলে সেচের কাজে ব্যবহার করতে গেলে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আপত্তি তোলে। এ নিয়ে দুই দেশে বেশ কয়েক বছর টানাপোড়েন চলে। অবশেষে ২০২২ সালে ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশ জকিগঞ্জের কুশিয়ারা নদী থেকে  ১৫৩ কিউসেক পানি উঠাতে পারবে। কিন্তু সিদ্ধান্তের দুই বছর পরও বাংলাদেশ সেখান থেকে পানি ওঠাতে পারছে না।

এ ব্যাপারে সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কুশিয়ারা নদীর পানি ব্যবহারের জন্য ভারতের সঙ্গে ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সদস্যগণ, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি সমাধানে আন্তরিক। আশা করা হচ্ছে, শিগিগরই এর সুরাহা হবে। তিনি বলেন, আমরা ভারতীয় পক্ষকে চিঠি দিয়েছি ভারতের করিমগঞ্জ এলাকা আবার পরিদর্শনের জন্য। 

সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শনে গেলে দেখা যায়, রহিমপুর পাম্প হাউজটি ৪০ ফুট মাটির নিচ থেকে উঠে বর্তমানে ৩৫ ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে অবকাঠামোটি পথিকের দৃষ্টি কাড়ে। এখানে চারটি পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন হবে রহিমপুর খালে। এলাকাবাসী জানান, ভারতীয় পক্ষ কুশিয়ারার অপরতীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৪২টি পাম্প বসিয়ে পানি ওঠাচ্ছে। কিন্তু আমরা পানি উঠাতে পারছি না। চালু না হওয়ায় রহিমপুর পাম্প হাউজের যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

যা রয়েছে ‘আপার সুরমা কুশিয়ারা’ প্রকল্পে: ‘আপার সুরমা কুশিয়ারা’ প্রকল্পের আওতায় সুরমা নদীর বামতীর ও কুশিয়ারা নদীর ডান তীরের ১৫৫ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্নির্মাণ, ২০ কি.মি. নতুন বাঁধ নির্মাণ, ৫৬ কি.মি. দীর্ঘ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ১৭৩ কি.মি. সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পাঁচটি পানি নিষ্কাশন স্লুইস, দুটি ব্রিজ, একটি পাম্প হাউজ এবং ৮১২টি সেচ কাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু রহিমপুর পাম্প হাউজটি চালু করতে না পারায় প্রকল্পের সুফল ঘরে তোলা যাচ্ছে না। 

সূত্র মতে, সিলেট সদর, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ এই পাঁচ উপজেলার কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মোট ৫৩ হাজার ৮২০ হেক্টর ও নিট চাষ যোগ্য ৩৫ হাজার ৬০০ হেক্টর এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং ১০ হাজার ৬০০ হেক্টর এলাকাকে সেচ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ২০০২ সালের জানুয়ারিতে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়।

শুরুতেই ধীরগতির অভিযোগ: এদিকে শুরু থেকেই এ প্রকল্পে অর্থায়নে ধীর গতি ছিল। স্বাভাবিকভাবে ব্যয় বাড়ে। প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর আবারও চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিক্ষেত্রে বড় একটি কাজ হবে। সেচের ব্যবস্থা হলে সারা বছর বহুমুখী ফসলে ভরা উঠবে এই এলাকা।’ 

উল্লেখ্য, ভারত থেকে আসা বরাক নদী জকিগঞ্জের আমলশীদে দুই ভাগে ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে ১৫-২০ কি.মি. সীমান্ত ঘেষে বিভিন্ন উপজেলার ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। এই দুই নদী ভরাটের কারণে বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

ইত্তেফাক/এনএন