আইএমএফ সমর্থিত ‘সংস্কারের ফাঁদে’ নিষ্পেষিত মিশরের মধ্যবিত্ত

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৪, ২০:৩৬

বছরের পর বছর ধরে সংকটে ভুগছে মিশরের অর্থনীতি। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নিয়ে তাদের সমর্থিত সংস্কার মেনে চলছে দেশটি। কিন্তু এই সংস্কারের প্রভাবে মিশরের মধ্যবিত্ত শ্রেণি জীবন ধারণে হিমশিম খাচ্ছে।

আইএমএফ সমর্থিত সর্বশেষ দফায় সংস্কারে প্রবেশের মধ্য দিয়ে আরও সঙ্কটে পড়েছে দেশটির সাধারণ মানুষ। দেশের বেশিরভাগ মধ্যবিত্তের কাছে মৌলিক হিসেবে বিবেচিত পণ্যগুলোই এখন হয়ে উঠেছে বিলাসিতা। জীবন ধারণে করতে হচ্ছে লড়াই।

বৈশ্বিক ঋণদাতা আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে মিশরে একটি উদার মুদ্রা বিনিময় বাজার এবং জনগণকে ভর্তুকি থেকে দূরে রাখার পদক্ষেপকে সমর্থন করে আসছে। ফলস্বরূপ মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয়েছে, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

বেসরকারি খাতের ২৭ বছর বয়সী চাকরিজীবী নুরহান খালেদ পারফিউম ব্যবহার ও চকলেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।

পশ্চিম কায়রোর একটি সুপারমার্কেটে ঢুকে কী কী তার ক্রয়তের সাধ্যে আছে- তা ভাবতে ভাবতে তিনি বলেন, 'আমার বেতনের পুরোটাই পরিবহন খরচ ও খাবার জোগাড় করতে চলে যায়।'

২৮ বছর বয়সী গৃহবধূ জয়নাব গামাল বলেন, 'আমরা এখন আর মিষ্টি কিনি না, দুধ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি।'

এমন পরিস্থিতিতেই মিসর গত মাসে জ্বালানি তেলের দাম ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা এক বছরে তৃতীয়বার বৃদ্ধি। এটিকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও বড় একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসর ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় আইএমএফের ঋণ নিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে এ বছর ঋণের পরিমাণ ৮০০ কোটি ডলার করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩৮ বছর বয়সী দুই সন্তানের মা বলেন, আমি যে জীবনধারা নিয়ে বেড়ে উঠেছি, তা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।

তিনি তার পরিবারের আয় বাড়ানোর জন্য মূল পেশার সাথে একটি খণ্ডকালীন শিক্ষকতার চাকরি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। যাতে তিনি তাদের সন্তানদের খেলাধুলা করার মতো জিনিসগুলোর খরচ বহন করতে পারেন।

তার পরিবার মাংসের জন্য বাজেট ছাঁটাই করেছে। তাদের মাংস খাওয়ার পরিমাণ চারগুণ থেকে কমিয়ে প্রতি সপ্তাহে দু'বার করা হয়েছে।

আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিশর এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সাল থেকে বৈদেশিক ঋণ চারগুণ বেড়ে ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগ ঋণ কায়রোর পূর্বে একটি নতুন রাজধানীসহ বড় আকারের প্রকল্পগুলোর জন্য অর্থায়নের ফলাফল।

গাজার যুদ্ধের প্রভাবও দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে খারাপ করে তুলেছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরের জাহাজে বারবার হামলার ফলে মিশরের গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজ খাল এ বছর রাজস্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে।

ক্রমবর্ধমান জনসাধারণের হতাশার মধ্যে কর্মকর্তারা সম্প্রতি আইএমএফ প্রোগ্রামকে পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি গত মাসে বলেছিলেন, যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের জনমতের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য করে, তাহলে অবশ্যই আইএমএফের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা মাদবৌলি কোন সময়সীমা নির্দিষ্ট না করে 'আসন্ন সময়ে' মিশরীয়দের উপর নতুন কোনো আর্থিক বোঝা চাপানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদরা অবশ্য বলছেন, আইএমএফ-এর এই সংস্কার ইতিমধ্যেই ধাক্কা খাচ্ছে।

ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পার্সোনাল রাইটসের সামাজিক ন্যায়বিচার ইউনিটের পরিচালক ওয়ায়েল গামাল বলেন, ওষুধ, সেবা ও পরিবহনের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

তিনি বিশ্বাস করেন, আইএমএফ প্রোগ্রামটি 'আরও দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এবং আরও ধীরে ধীরে' বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

তবে গামাল বলেন, আইএমএফ-সমর্থিত বর্তমান সংস্কারগুলো জনগণের ওপর 'আরও তীব্র' প্রভাব ফেলেছে।
দু'বছর আগেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করতে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। এখন আমি খাদ্য ও পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার আগে দু'বার ভাবি।

অপরদিকে, আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা তাদের কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, মিশরীয়রা আরও গতিশীল, আরও সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে আমাদের সংস্কারের সুবিধা দেখতে পাবে।

অর্থনীতিবিদ এবং পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ওয়ায়েল এল-নাহাস এই ঋণকে 'গিলে ফেলার জন্য তিক্ত বড়ি' হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি এটিকে একটি 'গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার' বলে অভিহিত করেছেন, যা সরকারকে 'পদ্ধতিগত' সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।

মানার বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতি কখনোই সত্য প্রমাণিত হয়নি। এখন শুধু এটুকুই ভাবতে পারি যে, ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়লে আমরা কী করব।

ইত্তেফাক/এসকে