মায়ের কোলে চড়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে তীর্থ দাস

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৪, ১২:৩৪

সুনীল-তাপসী দম্পতির বিয়ের পাঁচ বছর পর তাদের কোল জুড়ে আসে ছেলে সন্তান। বাবা মায়ের স্বপ্নপূরনে সন্তানের নাম রাখেন তীর্থ দাস। অন্য আট দশ জনের মত স্বাভাবিক জন্ম বেড়ে ওঠা হলেও সাত বছর বয়সে পায়ের গোড়ালিতে ফোড়ার মতো ফুলে গেলে ডাক্তারের কাছে যায়। তখনকার শিশু বিশেষজ্ঞরা জানান ডুসনি মাসকুলার ডিষ্ট্রফি (ডিএমডি) জটিল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত। এই রোগে কোন আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে উন্নত চিকিৎসা এখনো শুরু হয়নি। 

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা পঙ্গুত্ব ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে থাকার পাশাপাশি বয়স ১৫ হবার পর বেচে থাকার সম্ভাবনা কম থাকে। সন্তানের এমন সংবাদ শুনে ভেঙ্গে যায় তাদের স্বপ্ন। দুঃস্বপ্নকে তাড়া করে এই দম্পতি তাদের সন্তানকে নিয়ে দেশে চিকিৎসা শেষে পাড়ি জমায় ভারতে। সেখানকার ডাক্তারদের চিকিৎসা স্বপ্ন দেখালে শুরু করে মধ্যবিত্ত বাবা মা। পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচানো সম্ভব না হলেও চিকিৎসা চলমান থাকলে তীর্থে দাসের বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখান চিকিৎসক। 

চোখে পানিকে পুঁজি করেই স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাননি অদম্য মা তাপসী দাস। আজ সকল বাধা উপেক্ষা করেই ভর্তি হয়েছেন স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় গণ্ডিতে। এ বছর গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে  (২০২৩-২০২৪) সেশনে ভর্তি হয়েছে তীর্থ দাস। স্বপ্ন দেখেন একদিন বিসিএস কর্মকর্তা হয়ে দেশ সেবায় নিজকে নিয়োজিত করবেন স্বপ্নবাজ এই তরুণ।

মা বাবার স্বপ্ন পূরণে অদম্য তীর্থ দাসের কোন প্রতিকূলতাই তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে ২০২০ সালে স্কুল থেকে জিপিএ ৫ নিয়ে এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন ধনবাড়ী সরকারি কলেজে। কলেজের ভর্তি হওয়ার তীর্থ দাসকে হুইল চেয়ার কিনে দেওয়া হয়। হুইল চেয়ারে বসে চলাফেরা করলেও তার দু'পায়ে কোন শক্তি না থাকায় তাকে ক্লাসে নামানো আর উঠানোর কাজটা করতেন মা। ২০২২ সালে ধনবাড়ী কলেজ থেকে এ প্লাস নিয়ে এইচএসসি পাশ করেন। 

এবার তার স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে। যেই কথা সেই কাজ ২০২৩-২৪ সেশনে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর সাথে প্রতিযোগিতা করে ভর্তি পরীক্ষায় নিজের স্থান করে নেন মেধা তালিকায়। পছন্দের সাবজেক্ট দিতে গিয়ে ভর্তি হন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তার সাথে দেখা হয় তার ক্লাসের সহপাঠীদের সাথে। তার চোখে মুখে আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে হতে চায় দেশ সেরা ইঞ্জিনিয়ার।

আত্মপ্রত্যয়ী তীর্থ দাস বলেন, দুচোখে অনেক স্বপ্ন আমি ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে দেশের সেবা করতে চাই। আমার আম্মু আমার জন্য অনেক কেঁদেছে অনেক কষ্ট করেছে মায়ের চোখের পানি মুছে দিতেই আমি পড়াশোনাকেই বেছে নিয়েছি। শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতার জন্য আশেপাশে মানষের হতাশা থাকলেও পরিবারের সমর্থন ছিল সবসময়ই। 

তিনি জানান, বিশেষ করে তার তার বাবা-মা আর নানা-দাদা দুজনই সাপোর্ট দিয়েছেন সবসময়ই। কষ্ট করেছেন অনেক। এবার তার স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ ডিগ্রী হবেন দেশ ইঞ্জিনিয়ার।  

মা তাপসী দাস বলেন, প্রত্যেক বাবামায়েরাই স্বপ্ন দেখে সন্তানদের নিয়ে। আমার সন্তানকেও নিয়েও দেখেছি। কিন্তু ৭ বছর বয়সে ডুসনি মাসকুলার ডিষ্ট্রফি (ডিএমডি) কারণে স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে যায় ও দুপায়ে কোন ধরনের চলাচলের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। প্রথমে ডাক্তাররা আমাকে বেচে থাকার ব্যাপারে নিরুত্সাহী করলেও পরে সিএমসিতে নিয়ে গেলে সুস্থতার নিশ্চয়তা না দিলেও চিকিৎসা ব্যাপারে আমাকে আশা দেখান। সেই স্বপ্ন থেকেই আমার সন্তানকে নিয়ে আমি থেমে যায়নি। আমার ছেলের আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়ে চেষ্টা করেছি অনবরত। আজ আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আমার স্বপ্ন-পূরণ হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইসি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সুজন আলী বলেন, আমার বিভাগের ১৮তম ব্যাচের মধ্যে এরকম একজন ব্যতিক্রমী মেধাবী শিক্ষার্থী পেয়েছি। ইতিমধ্যে আমাদের বিভাগের শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার ক্লাস পরীক্ষার জন্য সবসময় নিচ তলায় ব্যবস্থা করবো যাতে হুইল চেয়ার নিয়ে উপরে উঠতে না হয়। এছাড়াও তার এগিয়ে যাওয়ার পাশে আমি থাকতে পারলে আমি শিক্ষক হিসেবেও গর্ববোধ করবো।

ইত্তেফাক/এএইচপি