বায়ুদূষণে হুমকিতে ঢাকার জনস্বাস্থ্য

সব দূষণ বিবেচনায় বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব তিন গুণ বেশি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:০০

বিশ্বের অন্যতম দূষিত বাতাসের শহর ঢাকা। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্য বড় শহরগুলোর অবস্থাও একইরকম। বায়ুদূষণের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সারা দেশের মানুষ। বায়ুদূষণের উত্সগুলো জানা থাকলেও অনেকটা দায়সারা জীবনযাপন করে আসছে মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় বায়ুদূষণ না থাকলে একজন নাগরিক আরো সাত বছরের বেশি সময় বাঁচত। সব দূষণের বিবেচনায় বায়ূদূষণের প্রভাব তিন গুণ বেশি। ফলে জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় সব উন্নয়ন হওয়া জরুরি। বন্ধ করা উচিত জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বায়ূদূষণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নকাজ চলাকালে দূষণ বাড়াবে। তবে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করে দূষণকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। মানুষকে সুস্থ ও ভালো রাখার জন্য আমাদের সব আয়োজন। সেই মানুষ যদি দূষিত বাতাস বুকে টেনে নিয়ে অসুস্থ, রোগাক্রান্ত হয় তাহলে উন্নয়নের সব আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবে। অতএব এখনি বায়ুদূষণের লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরার সময়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর ৬ মাস। লাইফ ইনডেক্সের মতে, ১৯৯৮ সালে বায়ুদূষণের কারণে গড় আয়ু কমেছিল প্রায় ২ বছর ৮ মাস, ২০১৯ সালে সেটি ৫ বছর ৪ মাসে দাঁড়িয়েছে। গবেষণা বলছে, দেশের ৬৪টি জেলাতেই বায়ুদূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত তিন গুণ বেশি। বায়ুদূষণ রোধে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ পরিবেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বায়ুদূষণের কারণে দেশে প্রতিবছর ৮০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি বিষণ্নতায় ভুগছেন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষ। বায়ুদূষণ বাংলাদেশে মৃত্যু ও অক্ষমতার দ্বিতীয় বড় কারণ। প্রতি বছর প্রায় ৮৮ হাজার মৃত্যুর জন্য বায়ুদূষণকে দায়ী করা হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা যান।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, বায়ুদূষণ এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। ধূলিদূষণ, ইটভাটা ও যানবাহনে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, কাশি, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যাথা, ফুসফুসে ক্যানসার, শুক্রাণুর ক্ষতি, জন্মগত ত্রুটি, স্ট্রোকের ঝুঁকি, কিডনির রোগ, হার্ট অ্যাটাক, মানসিক সমস্যা, হতাশা, বিষাদ, অস্থিরতা এবং অন্যান্য নেতিবাচক অনুভূতির প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য পড়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতিতে উত্স চিহ্নিত করে ধূলিদূষণ বন্ধ এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহত নিম্নমানের কয়লা আমদানি বন্ধ ও তরল জ্বালানি হিসেবে নিম্নমানের ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল বাজারে যেন বিক্রি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

স্টামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনুধাবন করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে বস্তুকণা ২.৫-এর মানমাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম থেকে কমিয়ে ৫ মাইক্রোগ্রাম করেছে, সেখানে সম্প্রতি পাশ হওয়া বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এর  ১ নম্বর তফসিলে বায়ুর মানমাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম থেকে বাড়িয়ে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম করা হয়েছে। অপরদিকে একই বিধিমালার তফসিল ৫ এ তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রের স্ট্যাক নিঃসারণের সর্বোচ্চসীমা সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইডসমূহ এবং বস্তুকণার মানমাত্রা যথাক্রমে ঘনমিটারে ২০০ এবং ৫০ মিলিগ্রাম করা হয়েছে, যা উন্নত দেশের মানমাত্রার চেয়ে ন্যূনতম ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি। অর্থাত্ উন্নত দেশগুলো তাদের দেশে উন্নয়নকাজ করার সময় নিঃসারণ মাত্রার যে মানদণ্ড মেনে চলে, আমাদের দেশে কাজ করার সময় সেই মানমাত্রা মানে না। আমাদের দেশে যে মেগাপ্রকল্প হচ্ছে তার হেলথ ইমপ্যাক্ট বিবেচনায় অর্থনৈতিক মূল্য নিরূপণ করা দরকার।

তিনি আরো বলেন, আমাদের উচিত সব উন্নয়নকে সবুজ চোখে দেখা। পরিবেশসম্মত নয়, এমন প্রকল্প বাতিল করা উচিত। অতীতে বায়ূদূষণ রোধে পদক্ষেপ নিলেও বাস্তবে তা কোনো কাজেই আসেনি। ফলে উচ্চ আদালতের ১২ দফা নির্দেশনার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সেটা আমাদের জানা নেই। আমরা শুধু লক্ষ্য করছি—বায়ুমান ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে।

হাইকোর্টের নির্দেশনার বাস্তবায়ন নেই

২০২০ সালের জানুয়ারিতে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইকোর্টের ৯ দফা নির্দেশনার মধ্যে নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, পানি ছিটানো এবং খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত মানার বিষয়গুলো ছিল। তবে সেগুলো মানা হয় না। গত দুই বছরে দূষণ দূর করতে ২০ বারের বেশি রুল জারি, তলবসহ নানা নির্দেশনা দেয় আদালত। গত ১৮ জানুয়ারি পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অস্বাস্থ্যকর, অতি অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক বায়ু সেবন থেকে জনসাধারণকে রক্ষায় অ্যালার্ট সিস্টেম চালুর মাধ্যমে জরুরি সতর্কবার্তা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বায়ুদূষণের প্রধান কারণ চিহ্নিত করতে এবং বায়ুদূষণ কমাতে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ নভেম্বর বায়ুদূষণের উত্স নিয়ন্ত্রণ, বায়ুমান মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত করা এবং আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এটি কঠোর নিয়ম বাস্তবায়ন এবং শিল্প, পরিবহন ও নগরায়ণে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির প্রসারে একটি পথনকশা হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে লাইভ বায়ুমান দেওয়া হয়েছে। মান অনুযায়ী ওয়েবসাইটে স্বাস্থ্যসুরক্ষা বার্তা থাকলেও এটি বড় পরিসরে প্রচার হচ্ছে না।

ইত্তেফাক/এনএন