মনির মুখে মুক্তার হাসি

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:৩৮

বাফুফের নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গতা পেল। ২১ জনের মধ্যে ১টি সদস্য পদ অমীমাংসিত ছিল। সেটি হয়ে গেছে। সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন সাইফুর রহমান মনি। তিনি পেয়েছেন ৫৬ ভোট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী এখলাছ উদ্দীন পেয়েছেন ৫১ ভোট। ৫ ভোটে জিতেছেন জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার মনি। ১৩৩ জন কাউন্সিলর, ১০৭ জন ভোট দিয়েছেন, অন্যরা আসেননি। বাফুফে ভবনে বেলা ১১টায় শুরু হয়ে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে বেলা ১টায়। নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণার সময় বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়ালসহ নির্বাহী কমিটির অনেকেই ছিলেন।

সাইফুর রহমান মনি বিজয়ী ঘোষণার পরই আবেগে কেঁদেই দিয়েছেন তিনি। টানা তিন নির্বাচন করেছেন, প্রতিবারই একটুর জন্য আটকে গিয়েছিলেন। পাশ করতে ত পারেননি তিনি । এবার গত ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মনি এবং এখলাছ উদ্দীন ৬১ করে ভোট পেয়েছিলেন। ভাগ্য নির্ধারণ করতে পুনরায় নির্বাচন হয়, শেষ পর্যন্ত পুনর্নির্বাচন করে তাকে জয়লাভ করতে হলো। চোখের পানি রাখতে পারলেন না। সবার আগে স্ত্রী আসমা সিকদারকে ফোন করে খবর জানিয়েছেন মনি। তার উত্তরে মনির স্ত্রী আসমা সিদকার বলেছেন, ‘এবার শখ মিটছে? যাও ফুটবলের জন্য আরো ভালোভাবে কাজ করো।’

মনি বললেন, ‘এবারও আমাকে নির্বাচন করতে না করেছিল সে। আমার স্ত্রী বাস্তববাদী, সে সবকিছু বুঝে। আমি ইলেকশনে ফেইল করলে কখন কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে সেটি আমার বউ ভালো জানে। আমার বউয়ের কোয়ালিটি আছে। সে অনেক কোয়ালিটির মেয়ে। আসমা আমার খেলাই বেশি দেখেছে। আমি যখন ঢাকা ভার্সিটিতে ছিলাম, আবার বউ ছিল ভিকারুন নিসার। ও সব সময় ডিপার্টমেন্টের খেলা হলে চলে আসত।’

মনির জন্য তার সঙ্গের ফুটবলাররা খুব দৌড়ঝাঁপ করেছে। ফুটবলার হয়ে ফুটবলারের প্রতি টান দেখা গেছে। বাফুফে ভবনে মাসুদ রানা, শুভ্র, মিলন, আজমল হোসেন বিদ্যুৎ, জালাল, টোটাম থেকে শুরু করে সবাইকে মনির পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে। মোহামেডান কোচ আলফাজও এসেছিলেন কাল। মাসুদ রানা বললেন, 'সবাই একই রকম না হলেও কিছু সাবেক ফুটবলার রয়েছেন যাদেরকে আমরা বাফুফে ভবনে বসার জন্য পেছন থেকে কাজ করেছি তাদের কেউ কেউ অচেনা হয়ে গেছেন।'

মনি দুই মেয়ের বাবা, বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন, এখন নেদারল্যান্ডসে পড়াশোনা করছেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। ছোট মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। মনির ফুটবল ক্যারিয়ার ৯৫ সালে শুরু হয় ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের জার্সি গায়ে। তিন বছর পর ৯৯ সালে ফরাশগঞ্জে খেলেছেন। ২০০০ থেকে ২০০১ রহমতগঞ্জ, ২০০২ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধায়। এরপর খেলা ছেড়ে দিয়ে কোচিং পেশায় চলে আসেন, আশুগঞ্জের ছেলে মনি। ৯৮ থেকে ২০০৮, জাতীয় দলে খেলেছেন তিনি।

খেলা ছাড়লেও মনি কোচিং পেশায় ছিলেন। উত্তরার আজমপুর, সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের দ্বিতীয় বিভাগের দল, গোপালগঞ্জ দলের কোচ ছিলেন, চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ এখন। একটি ফুটবল একাডেমিও পরিচালনা করেন তিনি। কোচের দায়িত্ব পালনকালীন সাইফুর মনি ছিলেন একমাত্র কোচ, যিনি প্রকাশ করে দিয়েছিলেন যে, তার দল পাতানো খেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাব ফুটবলে সততার সঙ্গে এত সাহস আর কেউ দেখাতে পারেননি।

মনি ফুটবলারদের জন্য নিঃশব্দ কাজ করেন। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে অন্যের পাশে থাকার কথা গোপন রাখেন। একবার তাকে কোচ হিসেবে অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। খেলোয়াড়দের জন্য প্রতিদিন নিজ পকেট থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ করতেন। প্রায় সময় বাইরে নিয়ে খাওয়ানোর উদ্যোগ নিতেন। খেলোয়াড়দের জন্য সাপলিমেন্ট কিনেছেন অন্তত ৫০ হাজার টাকার। ৯ দিনের অনুশীলন করে ভুটানে গিয়ে রানার্সআপ হয়েছিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল দল। ভুটানে ম্যাচ জিতলে খেলোয়াড়দেরকে ৫০০ ডলার বোনাস দিয়েছেন। ফাইনালে ১ হাজার ডলার দিয়েছেন। প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছেন বিনা দ্বিধায়। সাবেক ফুটবলার আজমল হোসেন বিদ্যুৎ বলছিলেন, ‘মনি অন্যরকম মানুষ। ওর কথা আলাদা।’ নির্বাচনের জেতার পর সোনালী অতীত ক্লাবে সবাই মিলে অভিনন্দন জানালেন মনিকে। ভোটারদেরকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মনি বলেন, ‘সভাপতি যে কাজটা দেবেন সেটাই আমি আমার কোয়ালিটি পারফরম্যান্স দিয়ে করার চেষ্টা করব। কারণ আমি আমার মেধাকে ফুটবলের জন্য কাজে লাগিয়েছি। লাগাতেও চাই।’

ইত্তেফাক/এএম