সাবরিনা সুলতান একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। ছেলেবেলা থেকেই তিনি বিশেষ এক হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তার আবেগ, অনুভূতি কিন্তু আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই। তাই বড় হওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যেও প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু সাবরিনা লক্ষ্য করেন তার এই আগ্রহ প্রকাশ করলে আশেপাশের মানুষের চোখ কপালে ওঠে। তিনি আশেপাশের মানুষ আর পরিবারকে বোঝাতে শুরু করেন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরও আছে পরিবার গঠনের, সন্তান জন্ম দেওয়ার আর বিয়ে করার অধিকার। অনেক কষ্টে অভিভাবককে রাজি করিয়ে ২০০৫ সালে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বিয়ে করেন সাবরিনা। ২০১২ সালে তিনি এই অধিকার নিয়ে লেখালেখি আর কাজ করতে শুরু করেন। যদিও কেউ কেউ নিজ দায়িত্বে এবং সচেতন কিছু পরিবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস—(বি-স্ক্যান) ও কৃষ্টির সভাপতি সাবরিনা সুলতান দীর্ঘ ২০ বছর কাজ করার পর বলেন, এখনো সমানভাবে পরিবার আর রাষ্ট্রে উপেক্ষিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিবার গঠনের অধিকার।
এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ বিকশিত নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে প্রতিবন্ধী জনগণ’ প্রতিপাদ্য করে পালিত হচ্ছে ৩৩তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ও ২৬তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিয়ে আর সংসার
প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শারীরিক প্রতিবন্ধী আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিয়েটা খুব একটা স্বাভাবিকভাবে ঘটে না যদিনা বর-কনে উভয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হন। সাধারণত অবস্থাসম্পন্ন ঘরের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনেক টাকাপয়সা খরচ করে ছেলেদের এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে যৌতুক দিয়ে পারিবারিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয়। হিন্দু , খ্রিষ্টান, মুসলিম সকল ধর্মেই এই প্রবণতা দেখা গেলেও মুসলিম পরিবারগুলো একটু সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। হিন্দু নারীদের বিয়েতে যৌতুক লাগে, প্রতিবন্ধী হলে তা আরও কয়েক গুণ বাড়ে। বর্তমান সময়ে পড়াশোনা করে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে প্রেমের বিয়ে কিছু দেখা যায়। তাদের সংসার খুব বেশি দিন টেকসই হয় না—এমন অনেক উদাহরণ থাকলেও কোনো পরিসংখ্যান নেই বলে জানান মিষ্টি। বি-স্ক্যান-এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বিয়ের বিষয়ে ব্যক্তি ও পরিবার সচেতন না। বিয়ের আগেই তারা বিয়ে ভাঙার আশঙ্কায় থাকে। বিয়ের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে। যদিও কোনো পরিসংখ্যান নেই তারপরও অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, বিবাহিতদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ পুরুষ আর ২৫ শতাংশ নারী। তিনি বলেন, বর প্রতিবন্ধী হোক কিংবা অপ্রতিবন্ধী, বিয়ের কনেকে হতে হবে নিখুঁত—এমন ধারণা সমাজে প্রচলিত। মিষ্টি বলেন, এগিয়ে যাওয়া এই সমাজের নারীর চাকরি করা, সন্তানদের পড়াশোনা করানো, বাজার-হাট করার মতো অবস্থায় প্রতিবন্ধীরা থাকে না বলে বিয়ের বাজারে তাদের উপেক্ষা করা হয়। কারণ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য এই সকল কাজ করার মতো অবকাঠামো আমাদের সমাজে গড়ে ওঠেনি। দরিদ্র পরিবারগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভর করে, আর এভাবে তাদের জীবনযাপন স্বাভাবিক মনে করে সমাজ।
বিয়ে করছেন কেউ কেউ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করে পেশায় ঢুকেও বাবা-মাকে সরাসরি নিজের বিয়ের কথা বলতে পারেননি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইফতেখার মাহমুদ। এক বন্ধুর মাধ্যমে বাবা-মাকে তার বিয়ের কথা জানাতে হয়। তার স্ত্রী একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। ইফতেখার বলেন, বিয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পুরুষরা সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে তার চেয়ে নিচু অবস্থার মেয়েকে বিয়ে করতে পারলেও নারীরা তা পারে না। প্রতিবন্ধী নারীদের বিয়ে কম হয়। হাসনা বেগম স্বামী ছাড়াই একমাত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে অ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার্স পাশ করান। মেয়ে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। হাসনা আর তার ভাইয়েরা মিলে জুলাই মাসে প্রতিবন্ধী এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেন মেয়ের। মেয়ে ফারজানা আক্তার বলেন, অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই তার বিয়ে হয়। এই রকম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিয়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কয়েকটি গ্রুপ কাজ করছে। একটি ম্যাচ মেকিং ওয়েবসাইট বানানোর চেষ্টা করছেন সগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফরম থেকে আমরা বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু সমাজ ও পরিবেশটা এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি বলে অনেক বিয়ে ভেঙে যায়।
আইনের কাছে যেতে পারেন না
ইউএসআইডি-এর আর্থিক সহায়তায় একতা প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরকারের আইনি সহায়তার প্রাপ্তির সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানের প্রতিবন্ধী অধিকার বিষয়ে সংস্থার নাজরানা ইয়াসমিন হিরা বলেন তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করছেন তবে তা চাহিদার তুলনায় কম মিলছে। আবার অনেক মানুষ এই সেবা সম্পর্কে জানেন না।
শহীদ সরওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. অজন্তা রাণী সাহা বলেন, মৃদু বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিয়ের ব্যবস্থা করছে পরিবার। অনেক দেশের তুলানয় বাংলাদেশ এই জায়গায় পিছিয়ে আছে। আর নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীমা ফেরদৌস বলেন, সরকার এই সকল বিষয়ে কাজ শুরু করছে।
‘৩৩তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ২০২৪’ ও ‘২৬তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস ২০২৪’ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুর বাবা-মা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত থাকেন। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে তিনি এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। একটি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়তে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

