কক্সবাজারের টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজির পাড়ায় পাওনা টাকা খোঁজার জেরে ফুটবলার জুবায়ের নামে এক যুবক বন্ধুর গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় গণমাধ্যমে নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ‘বন্ধুর গুলিতে বন্ধু নিহত’র কথা গুরুত্ব সহকারে প্রচার পায়। এ ঘটনায় রুজু হওয়া মামলায় স্থানীয় ইউপি সদস্য এনামুল হককে প্রধান আসামি করা হয়েছে। নির্বাচনী বিরোধকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অহেতুক ইউপি মেম্বারকে অন্যতম আসামি করায় মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে আবেদন করেন প্রধান অভিযুক্ত মেম্বার এনাম। আবেদন পেয়ে বিষয়টি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি।
দায়িত্ব পেয়ে শুক্রবার (৬ ডিসেম্বর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছেন বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম।
ভুক্তভোগী টেকনাফ সদরের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) এনামুল হক তার আবেদনে উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় পবিত্র রমজানের ইফতারের পর পাওনা টাকা চাওয়ার জের ধরে খুন হন আউলিয়াবাদ এলাকার জুবাইয়ের। এ হত্যাকাণ্ড ঘটান নিহতের বন্ধু নজুম উদ্দিন। তার সঙ্গে সহযোগী হন ফিরোজ, কায়েস, মাসুদ, মাছনসহ আরও কয়েকজন। ‘মাত্র ৮০০ টাকার জন্য বন্ধুর গুলিতে বন্ধু নিহত- এ শিরোনামে পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো ঘটনাটি। নিউজে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিহতের পরিবারের বক্তব্যে কারা জুবায়েরকে গুলি করে হত্যা করে তাদের নাম প্রকাশ পেয়েছিলো, কিন্তু ঘটনার দুইদিন পরে নিহত জুবায়েরের মা বাদী হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখ্য করে টেকনাফ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে সেখানে আমাকে প্রধান আসামি করা হয়।
মেম্বার এনাম আরও বলেন, আমার প্রতিপক্ষ নাজিরপাড়ার ছিদ্দিকের মামাতো বোন নিহত জুবায়েরের মা। তাকে হাত করে অহেতুক মামলায় আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। এ ঘটনার আদ্যোপান্ত নিয়ে নিহতের পরিবার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ ও জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন।
তিনি দাবি করেন, নিহত জুবায়ের হত্যা মামলা সুষ্ঠু তদন্তে পুলিশের মহাপরিদর্শক আইজিপি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি ও কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার বরাবরে আবেদন করা হয়। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম ডিআইজি, ঘটনার দিনে নিহত পরিবারের গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্য ও গ্রেপ্তার আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি পত্র-পত্রিকার নিউজ বিশ্লেষণ করে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। আর মামলাটি টেকনাফ থানা থেকে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তর করা হয়।
স্থানীয়দের মতে, ঘটনার পরই টেকনাফ থানার ওসি ওসমান গণির নেতৃত্বে পুলিশের টিম জুবায়ের হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ঘাতক নজুম উদ্দিনের আপন মামাতো ভাই মাসুদ ও মুহাম্মদ হোছনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতে তারা জবানবন্দি দেয়। আদালতে তাদের জবানবন্দিতে উঠে আসে কারা জুবায়েরকে হত্যা করেছেন ও হত্যাকাণ্ডে কতজন অংশ নেয়। ঘাতক নজুম উদ্দিন, জুবায়েরকে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি আদালতে উল্লেখ্য করে। গ্রেফতার দুই ব্যক্তির জবানবন্দির পরে মামলার তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে ষড়যন্ত্রের অংশে হিসাবে মামলার এজাহারের চতুর্থ সাক্ষী নাটকীয়ভাবে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে আদালতে এনাম মেম্বারের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেয়। অথচ এসব সাক্ষী ও মামলার বাদী জুবায়ের হত্যার পর গণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যজনের নাম বলেছিলো। যার ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে সবার কাছে।
নাজিরপাড়া বড় জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম বিএ বলেন, জুবায়েরকে কারা গুলি করে হত্যা করেছে দিনের মতো পরিষ্কার। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে জুবায়ের হত্যা মামলার বাদীকে মোটা অংকের টাকায় হাতে নিয়ে স্থানীয় মেম্বারসহ কয়েকজনকে অহেতুক আসামি করা হয়েছে। মামলাটি সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।
মামলায় এনাম মেম্বারকে আসামী করার বিষয়ে জানতে চাইলে নিহত জুবায়েরের মা মামলার বাদী মাবিয়া খাতুন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তদন্তে সব বেরিয়ে আসবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আজ (শুক্রবার) সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া যাবে তাদের প্রত্যেককে আমরা বিচারের মুখোমুখি করবো।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ডিবির কর্মকর্তাকে সরেজমিন সাক্ষীদের জবানবন্দি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলাসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাচাই করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই করেই আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হবে। স্বচ্ছ পুলিশিংয়ের বাইরে যাবে না এ হত্যা মামলার প্রতিবেদন। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে মামলাটি।
