পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির কথা উঠলেই যে বিষয়টি সামনে চলে আসে তাহলো সরকারি কোম্পানিগুলো কেন তালিকাভুক্ত হচ্ছে না? একইসঙ্গে আসে বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিষয়টিও। গত দুই দশকে কোন খাতের কতগুলো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে—এ সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে বিস্মিত হওয়ার মতো তথ্য উঠে এসেছে। গত দুই দশকে মাত্র ৯টি সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচটি সরকারি ও চারটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, দেশের পুঁজিবাজারের বড় সমস্যা এখানে ভালো কোম্পানির মারাত্মক অভাব। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির কোনো বিকল্প নেই। সরকারও চাচ্ছে পুঁজিবাজারে সরকারি কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হোক। কিন্তু তারপরও কেন গত দেড় দশকে একটিও সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি? বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই বা কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহ নেই?
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে ব্যবস্থাপনাতে পরিবর্তন আসে। বছরে চারবার আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়। এছাড়া, নানা নিয়ম-নীতি পরিপালন করতে হয়। এতে সরকারি কর্মকর্তাদের দাপট কমে যায়। ফলে তারা চান না কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হোক। অন্যদিকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে যখন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন কোম্পানিগুলো জানতে চায় তালিকাভুক্ত হলে তাদের কি লাভ হবে? তারা যখন দেখে তালিকাভুক্ত হলে বিশেষ কোনো লাভ হবে না তখন তারা আর আগ্রহ দেখায় না।
দেশের শেয়ার বাজারে গত দুই দশকে সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৫ থেকে ২০০৯ এই সময়ে পাঁচটি সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো: যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, তিতাস গ্যাস, ডেসকো ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লি.। এই সময় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ছিলেন ফারুক আহমেদ সিদ্দীকী। এরপর গত দেড় দশকে আর একটিও সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। অন্যদিকে ২০০২ থেকে ২০০৫ সময়কালে যখন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিমকে তালিকাভুক্ত করা হয়। এছাড়া, জিয়াউল হক খন্দকার যখন বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন (২০০৯-২০১১) তখন ম্যারিকো বাংলাদেশ, আরএকে সিরামিকস্ ও গ্রামীণফোনের মতো বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা হয়। সে সময় গ্রামীণফোনের তালিকাভুক্তিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এরপর দীর্ঘসময় (২০১১-২০২০) বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন ড. খায়রুল হোসেন। এসময় সরকারি ও বহুজাতিক কোনো কোম্পানিই তালিকাভুক্ত হয়নি। শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের কমিশন (২০২০-২০২৪) রবি আজিয়াটা লিমিটেডকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসেন।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারের যে দূরাবস্থা তাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে মুনাফায় থাকা ভালো সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই। কারণ, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসের পর ভালো মানের আইপিও আসেনি বললেই চলে। এমন সব কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে যার বেশির ভাগই এখন রুগ্ন।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে ১৯টি সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। বিএসইসি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ১৭টি সরকারি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত হতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে ১৭টি প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ও আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মাজেদা খাতুন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সরকারি কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি নিয়ে আইসিবি কাজ করছে। অর্থ উপদেষ্টা মহোদয়ও চাচ্ছেন, সরকারি আরো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসুক। তিনি বলেন, আমরা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করছি। তবে এই মুহূর্তে কোম্পানির নামগুলো জানাতে চাচ্ছি না। আশা করছি, নতুন বছরে দেশের পুঁজিবাজারে আমরা আরও সরকারি কোম্পানি দেখতে পাব। বিএমবিএ সভাপতি বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারের গভীরতা কম। এক্ষেত্রে সরকারি কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারের হাতে ৫১ শতাংশের বেশি থাকা শেয়ারগুলো অফলোড করলে বাজারে শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ও বিদেশ থেকে ঋণ নেয়। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার ও গ্রিন বন্ড বিক্রি করে সরকার এসব অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।
দেশে পুঁজিবাজারে বহুজাতিক কোম্পানির সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি
বাংলাদেশে প্রায় ৪১টি বহুজাতিক কোম্পানি ব্যবসা করছে। এর মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত রয়েছে মাত্র ১১টি কোম্পানি। এগুলো হচ্ছে—বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন বাংলাদেশ যা এখন ইউনিলিভার, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো, গ্রামীণফোন, রবি, ম্যারিকো বাংলাদেশ, লিন্ডে বাংলাদেশ, রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেড, সিঙ্গার বাংলাদেশ ও বাটা সু।
বর্তমানে দেশে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করছে ইউনিলিভার (টয়লেটট্রিজ), নেসলে ফুড, প্রক্টার অ্যান্ড গ্যাম্বল, ব্যাংকের মধ্যে এইচ এস বি সি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিটি ব্যাংক এন এ-সহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এর আগে নানা উদ্যোগ নিয়েও দেশে ব্যবসারত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আনা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বহুজাতিক কোম্পানি কী কারণে পুঁজিবাজারে আসছে না, সে বিষয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণও তুলে ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। চিঠিতে বলা হয়েছে, যেসব বিদেশি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তাদের করহার অতালিকাভুক্ত বিদেশি কোম্পানির করহারের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম নির্ধারণ করা যেতে পারে। এছাড়া যেসব বিদেশি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, তাদের নগদ লভ্যাংশের ওপর বর্ধিত হারে করারোপ করা যেতে পারে। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে তুলতে ট্যাক্স হলিডে প্রদানসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ব্যবসা করার জন্য কোম্পানিগুলোকে আরজেএসসি থেকে নিবন্ধন সনদ নিতে হয়। এ নিবন্ধনের সময় শর্তারোপ করে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির ব্যাপারে বাধ্য করা যেতে পারে। কোম্পানির মূলধনের একটি নির্দিষ্ট অংশ পুঁজিবাজার থেকে পাবলিক অফারের মাধ্যমে সংগ্রহের শর্ত আরোপ করা যেতে পারে। এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কোনো না কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এদের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বাধ্য করার সুপারিশ করেছে বিএসইসি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও এ প্রসঙ্গে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে একটি কোম্পানিকে নানা নিয়ম-নীতি পরিচালন করতে হয়। এছাড়া, এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ননলিস্টিং কোম্পানির চেয়ে লিস্টিং কোম্পানি বেশি ভ্যাট, ট্যাক্স দেয়। তাহলে তারা কেন পুঁজিবাজারে আসবে? এছাড়া আমাদের এখানে আইপিও প্রসেস হতে অনেক সময় লাগে। সে তুলনায় ব্যাংক থেকে সহজেই ঋণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সে ধরনের কোনো আইন নেই।
ডিএসইর এই পরিচালক বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখে। তাই সরকারের উচিত, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়া।
