১২ দিন হলো কাজে যোগদান, ১৫ বছরে নিভলো মাজেদুলের জীবন প্রদীপ

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৩:৫২

মাত্র ১২ দিন আগে কাজ শুরু করেছিল মাগুরার মহম্মদপুরের ১৫ বছরের কিশোর মাজেদুল ইসলাম। মেঘনা নদীতে নোঙর করা এমভি আল-বাখেরা নামের জাহাজে লস্করের পদে যোগ দিয়েছিল সে। স্বপ্ন ছিল পরিবারের জন্য কিছু করার, পাশাপাশি দশম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনায় ফিরবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। চাঁদপুরের হরিণা ফেরিঘাটের পশ্চিমে মেঘনা নদীর পাড়ে মাঝিরচর এলাকায় নোঙর করা এমভি আল-বাখেরা নামের জাহাজে বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ হারায় মাজেদুল।

জানা যায়, চর যশোবন্তপুর গ্রামের আনিচ মোল্লার ছেলে মাজেদুল, ছিল পরিবারের সবার ছোট। নবম শ্রেণির পরীক্ষা শেষ করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য শখের বশে কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু এখন পরিবারের কাছে ফিরল তার নিথর দেহ। মাজেদুলের বাবা ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। পরিবারের আর্থিক চাপ সামলাতে এই কিশোর পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু করতে চেয়েছিল। 

এদিকে মাজেদুলের মৃত্যুতে পুরো গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার বন্ধুরা ও পরিচিতরা বিশ্বাসই করতে পারছে না যে, সদা হাস্যোজ্জ্বল এই কিশোর আর তাদের মাঝে নেই। 

মাজেদুলের চাচা রাজিব মিয়া বলেন, মাজেদুলের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। পরিবারের সবার জন্য সে কিছু করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার জীবন এমনভাবে শেষ হয়ে যাবে, তা কেউ ভাবেনি।

মহম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহমান বলেন, মাজেদুলের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। তার মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিষয়টি আমরা গভীরভাবে তদন্ত করছি।

পণ্যবাহী জাহাজটি গত রোববার সকাল ৮টার দিকে চট্টগ্রামের কাফকো সার কারখানার ঘাট থেকে যাত্রা করে। এরমধ্যে কোম্পানির মালিক শিপন বাখেরা জাহাজে ফোন করে কাউকে পাননি। এতে সন্দেহ হয় মালিকপক্ষের। জাহাজের অবস্থান এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে মেসার্স বৃষ্টি এন্টারপ্রাইজের অন্য জাহাজ মুগনি-৩ থেকে যোগাযোগ করার জন্য বলা হয়। ওই সময় মুগনি-৩ জাহাজটি মাওয়া থেকে ঘটনাস্থল দিয়ে অতিক্রম করার সময় বাখেরা নামক জাহাজটিকে দেখতে পায়। ওই সময় তারা জাহাজের লোকদের রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেন। ফোন পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জাহাজ থেকে নিহত ও আহতদের উদ্ধার করেন। তারা যখন জাহাজটিতে উঠেছিলেন, তখন ইঞ্জিন বন্ধ ছিল।

পরে জাহাজটি থেকে ৫ জনকে মৃত ও ৩ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ২ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বেঁচে যাওয়া একজনের তথ্যের ভিত্তিতে আকাশ মন্ডল ইরফান নামে জাহাজের এক স্টাফকে বাগেরহাট থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। 

আকাশ মন্ডল ইরফানকে জিজ্ঞাসাবাদের পর র‌্যাব জানায়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেপ্তার আকাশ ঘটনার দিন সন্ধ্যায় জাহাজে রাতের খাবারের তরকারির মধ্যে ৩ পাতা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়। শুধু সুকানি জুয়েল এবং গ্রেপ্তার আকাশ ছাড়া সবাই রাতের খাবার খেয়ে তাদের নিজস্ব কেবিনে ঘুমিয়ে পড়ে। রাত আনুমানিক ২টার দিকে সাহারা বিকন এলাকায় আরও ৮-১০টি জাহাজের সঙ্গে সুকানি জুয়েল এবং গ্রেপ্তার আকাশ তাদের জাহাজটি নোঙ্গর করে। পরবর্তীতে সুকানি জুয়েল রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে আকাশ তার পরিকল্পনা মোতাবেক আনুমানিক রাত ৩টার দিকে প্রথমে মাস্টারকে জাহাজে থাকা চাইনিজ কোড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে সে চিন্তা ভাবনা করে যে, জাহাজে থাকা বাকিরা জেনে গেলে সে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়বে বিধায় একে একে সবাইকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে আনুমানিক ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সব জাহাজ তাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেলে সে নিজে জাহাজ চালাতে থাকে এবং একপর্যায়ে মাঝিরচর নামক এলাকায় জাহাজটি আটকা পড়লে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ট্রলারে বাজার করার কথা বলে ট্রলারে উঠে পালিয়ে যায়। তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়াতে বাগেরহাটে চিতলমারি এলাকায় আত্মগোপনে চলে যায়। পরবর্তীতে আত্মগোপনে থাকাবস্থায় র‍্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে।

ইত্তেফাক/কেএইচ