পাবনার বেড়া উপজেলার মৃৎশিল্পীদের মাটির তৈরি পণ্যের সুখ্যাতি ছিল আশপাশের জেলাগুলোতেও। কিন্তু বর্তমানে নানা সংকটে হারিয়ে যাওয়ার পথে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। উপজেলার বেশির ভাগ মৃৎশিল্পী আর্থিক সংকট এবং সঠিক সহায়তার অভাবে বেকার হয়ে পড়েছেন। তারা পরিবারের সেবা ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাতে অনেকটা বাধ্য হয়েই অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।
বেড়া উপজেলার মৃৎশিল্পীদের ইতিহাস অনেক পুরোনো। মাটির কলস, হাঁড়ি, কুলা, থালা, টব এবং নানা ধরনের শৌখিন পণ্য তৈরি করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন এখানকার মৃৎশিল্পীরা। কিন্তু আজ তাদের এই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে। বেড়া পৌর এলাকার দক্ষিণ কর্মকারপাড়া মহল্লায় ভ্যানে করে মাটির তৈরি পণ্য বিক্রি করতে আসা সুজল পাল বলেন, বর্তমানে বেচা-বিক্রি অনেকটাই কম। সারা দিন পাড়া-মহল্লা ঘুরে বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো মতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর এ পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
বেড়ার পৌর এলাকার মালদাপাড়া মহল্লার যষ্ঠি পাল বলেন, 'একসময় মাটি দিয়ে তৈরি করা সামগ্রী বিক্রি করে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করতাম। কিন্তু এখন বাজারে মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে গেছে এবং কাঁচামালও অত্যন্ত দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে পণ্য তৈরি করা আর লাভজনক হচ্ছে না।' তিনি আরো বলেন, বর্তমানে মাটির পণ্য তৈরি করে যা রোজগার হয় তা দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমাদের অনেকেই এ পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় উপজেলার বনগ্রাম, মালদাহপাড়া, হাটুরিয়া-নাকালিয়া, রাকশা, পুন্ডুরিয়া এলাকার বেশির ভাগ মৃৎশিল্পী বেকার হয়ে পড়েছে। তারা এ কাজ করে তাদের সংসারের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। অনেকেই জানান, এ পণ্য তৈরিতে যতটুকু কাঁচামাল প্রয়োজন তা সঠিক দামে পাওয়া যায় না। মাটির দামও বেড়ে যাওয়ার ফলে আমাদের পণ্য তৈরি খরচ অনেকেটাই বেড়ে গেছে। এদিকে বাজারে মাটির তৈরি পণ্যের চেয়ে সস্তা ও কৃত্রিম পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে। বাজারে এসব পণ্যের দাম কম হওয়ায় মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে গেছে।
মৃৎশিল্পীরা বিভিন্ন মেলাগুলোতে মাটির তৈরি পণ্য বিক্রি করে কিছু আয় করতেন। কিন্তু বর্তমানে মেলার সংখ্যা কমে যাওয়ায় মাটির পণ্য বিক্রিও কমে গেছে। যার ফলে মৃৎশিল্পীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে কম মূল্যে মাটির তৈরি পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে অনেক মৃৎশিল্পীই অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই কৃষি কাজ, রিকশা চালনা এবং দোকান কর্মচারীর কাজ শুরু করেছেন।
মনজুর কাদের মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, মাটির তৈরি পণ্য পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। মাটি তৈরি পণ্যের গুণমান সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাসহ পরিবেশবান্ধব এ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

