নারিকেলের ছোবড়ায় তৈরি হচ্ছে প্রয়োজনীয় পণ্য

কোকোডাস্ট ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:৩০

এক যুগ আগেও ফেলে দেওয়া হতো নারিকেলের ছোবড়া। আবার কেউ কেউ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই ছোবড়া এখন আর ফেলনা নয়। জাজিম, গদি, দড়ি, জুতা, সোফা, খেলনা ও শৌখিনসামগ্রী এবং কৃষিপণ্যসহ নানা জিনিস তৈরি হচ্ছে নারিকেলের ছোবড়া থেকে। রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। জেলায় ইতিমধ্যে ছোবড়া পণ্যের ৩০টির মতো কারখানায় উৎপাদন চলছে।

ছোবড়ার আঁশ থেকে ঠিক কত আয় হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান বিসিক বা সরকারি কোনো দপ্তরেও নেই বলে জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা বিসিক কার্যালয়ের প্রমোশন কর্মকর্তা মো. জুয়েল চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ফেলনা এই নারিকেলের ছোবড়া থেকে এখন কোটি টাকা আয় হচ্ছে। নারিকেলের ছোবড়ার আঁশ ও গুঁড়া দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।'

লক্ষ্মীপুর জেলায় নারিকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ ও গুঁড়া তৈরি হচ্ছে। নারিকেলের আঁশ (ফাইবার) থেকে জাজিম, গদি, দড়ি, স্লিপার (জুতা), খেলনা ও শৌখিনসামগ্রী তৈরি হয়। ফাইবার তৈরির সময় প্রচুর গুঁড়াও উপজাত হিসেবে উৎপাদিত হয়। এসব গুঁড়া বা কোকোডাস্ট কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। যেসব বাগানে মাটির অভাব রয়েছে, সেখানে এসব গুঁড়া ব্যবহৃত হয়।

ছোবড়া প্রসেসিং কারখানা গড়ে উঠেছে জেলার সদর উপজেলার দালাল বাজার, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ,রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ, রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া, মীরগঞ্জ, সোনাপুর, কমলনগর উপজেলা হাজীরহাট, রামগতির আলেকজান্ডার ও জমিদারহাটে। এসব এলাকায় ছোটবড় ৩০টি কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারখানায় নারী ও পুরুষ মিলে কমপক্ষে ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করেন।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারের একটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কারখানা চত্বরে নারিকেলের ছোবড়ার স্তুপ। ডিজেলচালিত ছোবড়াকাটার যন্ত্রে ছোড়া কেটে ছোট ছোট খণ্ড করা হচ্ছে। সেই খণ্ড হাত দিয়ে ছিঁড়ে আঁশ পৃথক করছেন কয়েকজন নারী ও পুরুষ। এই আঁশ রোদে শুকানো হচ্ছে। পরে শুকনো আঁশ পরিমাপ করে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে বেঁধে তৈরি করা হচ্ছে গাঁট। গাঁটকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘বেল' (২০ কেজিতে ১ বেল)। ছোবড়া থেকে আঁশ ছাড়ানোর সময় বের হওয়া গুঁড়া বস্তায় ভরে একপাশে স্তুপ করা হচ্ছে। এই ছোবড়া ও গুঁড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।
কারখানার মালিক জাকির হোসেন জানান, একটি নারিকেলের ছোবড়া কেনা হয় দুই থেকে তিন টাকায়। পরে ছোবড়া থেকে পাওয়া ছয় থেকে সাত ট্রাক আঁশ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয় এই কারখানা থেকে। প্রতি ট্রাক আঁশের দাম ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ভালো দামে বিক্রি হয় ছোবড়ার গুঁড়াও। স্থানীয় নারিকেল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা ছোবড়া সংগ্রহ করেন। কারখানায় ৮-১০ জন শ্রমিক ছোবড়া থেকে আঁশ বের করেন।

প্রায় ৫০ বছর ধরে নারিকেলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দালাল বাজারের শশীভূষণ নাথ। ১২ বছর ধরে তিনিও নারিকেলের পাশাপাশি ছোবড়ার ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, নারিকেলের ছোবড়ার ওপর ভিত্তি করে এক যুগ আগে জেলার দালালবাজার ও হায়দারগঞ্জে দুইটি কারখানা হয়েছে। এসব কারখানার ছোবড়ার আঁশ ও গুঁড়া খুলনা, ঢাকা, কক্সবাজার, শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। সেখানে কারখানায় তোশকের (ম্যাট্রেস), জাজিম, পাপোস, দড়ি, সোফা ও চেয়ারের গদিসহ বিভিন্ন ধরনের শৌখিন ও প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করা হয়।

লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ জানান, জেলায় ২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে নারিকেলের বাগান রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় রয়েছে নারিকেলগাছ। ২৩- ২৪ অর্থবছরে ২৬ হাজার মেট্রিক টন নারিকেল উৎপাদিত হয় লক্ষ্মীপুরে।

ইত্তেফাক/এনএন