কান পাতিয়া শুনিতে হইবে–বিবেক কী বলে

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫, ০৫:০০

শেখ সাদির ‘বিচার নেই' গল্পটি আজিকার সমাজেও সমান প্রাসঙ্গিক। এই গল্পের বিষয়বস্তু অনেকটা এই রকম—একবার এক প্রতাপশালী বাদশাহর কঠিন অসুখ হইলে রাজবৈদ্যরা পরামর্শ দেন, একজন যুবকের হৃৎপিণ্ড দিয়া ঔষধ তৈরি করিয়া সেবন করিলেই কেবল বাদশা আরোগ্য লাভ করিবেন। বাদশার জীবন রক্ষার প্রশ্ন যেই হেতু, তাই রাজ্যময় তন্নতন্ন করিয়া একজন সুস্থ-সবল যুবকের অনুসন্ধান করা হয়। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে যুবককে বিক্রয় করিয়া দেন তাহার পিতা। রাজ্যের কাজি সাহেব বিচারসভায় ঘোষণা দিয়া দেন—‘এই ছেলের জীবন বধ করা অন্যায় কোনো কাজ নহে। কারণ, এই ছেলের তুচ্ছ জীবনের বিনিময়ে বাদশাহর মূল্যবান জীবন রক্ষা পাইবে।' যেই কথা সেই কাজ! যুবকের হৃৎপিণ্ড কাটিবার জন্য উদ্যত হন জল্লাদ। 

মজার ব্যাপার হইল, এই সকল দৃশ্য দেখিয়া যুবকটি ভীত-সন্ত্রস্ত না হইয়া বরং মিটিমিটি হাসিতে থাকেন! খোদ বাদশাহ তাহার নিকট জানিতে চাহেন, ‘তুমি মুত্যুর মুখে দাঁড়াইয়াও এইরকমভাবে হাসিতেছ কেন?' জবাবে ছেলেটি হাসিতে হাসিতেই বলে, “হায় আমার জীবন! আমি হাসিব না তো কে হাসিবে বলুন? যেই পিতার দায়িত্ব আমাকে রক্ষা করা, সেই তিনিই অর্থের বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করিয়া দিয়াছেন। কাজির দরবারে মানুষ যায় সুবিচারের আশায়, কিন্তু সেই কাজি সাহেব অন্যায়ভাবে বাদশাহর পক্ষ নিয়াছেন। আর বাদশাহর কর্তব্য কী? গরিব-দুঃখী, অত্যাচারিত, নিপীড়িত প্রজাদের রক্ষা করিবার মহা দায়িত্ব তাহার কাঁধে। কিন্তু তিনি নিজের জীবন রক্ষা করিবার জন্য অন্যের জীবনকে তুচ্ছ করিয়া দেখিতেছেন। অথচ অন্যের জীবনও যে তাহার নিজের নিকট অতি মূল্যবান—এই সামান্য কথা বাদশাহ মনেই রাখিলেন না! জগৎ-সংসারের এই সকল খেলা দেখিয়াই আমি হাসিতেছি!' যুবকের কথা শুনিয়া বাদশাহ চুপ হইয়া যান এবং ঐ যুবককে মুক্ত করিয়া দেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হইল, এই ঘটনার কিছুদিন পরই বাদশাহ আরোগ্য লাভ করিয়া সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া উঠিলেন।

মানবসভ্যতার পথপক্রিমায় এই ধরনের নানা ঘটনা গল্পাকারে লিপিবদ্ধ হইয়াছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়, যাহা যুগের পর যুগ আমাদেরকে বিবেক ও মনুষ্যত্বের শিক্ষা দিয়া যাইতেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল, আমরা ইতিহাস হইতে শিক্ষা গ্রহণ করি না বা করিতে চাহি না! ‘When the heart is blinded, it doesn't matter if the eyes see.' অর্থাৎ, ‘হৃদয় যখন অন্ধ হইয়া যায়, তখন চোখে দেখিলেই কী, আর না দেখিলেই কী!' ইহা কি আমাদের বিবেকহীনতার কারণ নহে? বর্তমান সমাজে আমরা এমন সকল ঘটনা ঘটিতে দেখি, যাহা দেখিয়া গল্পের সেই যুবকের মতোই মিটিমিটি হাসিতে হয়—কোন পথে হাঁটিতেছি আমরা? শিক্ষককে অপমান-অপদস্থ করিতেছে শিক্ষার্থীরা, সদ্যোজাত সন্তানকে ডাস্টবিনে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া যাইতেছেন মাতা, পিতা মারিতেছেন পুত্রকে, ভাইয়ের হাতে খুন হইতেছে ভাই। ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এই ধরনের বিবেকবর্জিত কমকাণ্ডের মচ্ছব প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। মূলত এই কারণেই উপদেশ হিসাবে বলা হইয়া থাকে, ‘আবেগ বিবেক মাথা, তারপর হোক কথা'।

একটি জনপদ আইন দিয়া যতখানি সুচারুরূপে চালানো যায়, তাহার চাইতে অধিক ভালোভাবে চালানো যায়, যদি সেই সমাজের মানুষ বিবেকবান হয়। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র যেমনটি বলিয়াছেন, ‘জীবনে মাঝে মাঝে এমন অবস্থান গ্রহণ করিতে হয়, যাহা না নিরাপদ, না রাজনৈতিক আর না জনপ্রিয়; শুধু একটি কারণে যে, তাহার বিবেক সেইটাকে সঠিক বলে।'

সুতরাং, ব্যক্তিগত, সামাজিক বা রাজনৈতিক জীবনে চলার পথে আমরা যেন কোনোক্রমেই বিবেক ‘বন্ধক’ না দিই! বিবেক বন্ধক থাকিলে সেই সমাজ হানাহানি-রাহাজানির ঘূর্ণিপাকে পড়িয়া যায়। বিবেক হইল পৃথিবীর সবচাইতে বড় আদালত। কোনো কাজে মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হইলে কান পাতিয়া শুনিতে হইবে—আমাদের বিবেক কী বলে? বিবেক একজন মানুষের জন্য কম্পাসের মতো। ইহা ‘স্রষ্টার আওয়াজ’, যাহা প্রতিটি মানুষের অন্তরে বাজে। প্রয়োজন কেবল সেই আওয়াজে সাড়া দেওয়া।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন