গাজায় ইসরায়েলি বোমা হামলার কারণে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়ে একটি তাঁবুতে বসবাস করে আসছিলেন আহমেদ আল-কিদরা। শেষ পর্যন্তও তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। ফিরতে চেয়েছিলেন বাড়িতে।
আহমেদ রোববার তার সাত সন্তানকে একটি গাধার গাড়িতে তুলে পূর্ব খান ইউনিসের দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কিছু সময় বিলম্বিত হয়েছে, পরিবারটি তা জানত না। তারা জানত না, এখনো ইসরায়েলি বিমানগুলো বোমা ফেলার প্রস্তুতি নিয়ে উড়ছে গাজার আকাশে।
কিন্তু হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। আহমেদের স্ত্রী হানান এই শব্দ শুনেছেন। তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। আর কয়েক ঘণ্টা পরে স্বামী এবং সন্তানদের সঙ্গে একত্রিত হাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।
হানান বলেন, 'বিস্ফোরণটি আমার হৃদয়ে আঘাত করেছে বলে মনে হচ্ছিল।' তিনি সহজাতভাবে একজন মা হিসেবে বুঝে যাম, তার বাচ্চাদের সঙ্গে কিছু ঘটেছে, যাদের সবেমাত্র বিদায় জানিয়েছেন।
'আমার বাচ্চারা, আমার বাচ্চারা' - এভাবেই চিৎকার করে আহাজারি করছিলেন হানান। গাধার গাড়িটা তছনছ হয়ে গিয়েছিল।
ইসরায়েলের এই নিকৃষ্ট হামলায় হানানের বড় ছেলে ১৬ বছর বয়সী আদলী ঘটনাস্থলে মারা গেছে। একইভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় সবার ছোট ছয় বছর বয়সী মেয়ে সামা।
১২ বছর বয়সী আরেক ছেলে ইয়াসমিন জানায়, তাদের গাধার গাড়ির সামনে একটি চার চাকার মোটরযান ছিল। সম্ভবত তাদের লক্ষ্য করেই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়েছিল।
ইয়াসমিন বলছিল, আমি সামা ও আদলীকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি। আর বাবা রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় গাড়িতে পড়ে ছিলেন।
এ সময় আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্রটি সেখানে দ্রুত আঘাত হানার আগেই সে আট বছর বয়সী বোন আসিলকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে সরিয়ে নেয়। প্রাণে বেঁচে যায় ১১ বছরের মোহাম্মদও। পরে হানানের স্বামী আহমেদকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
'আমার সন্তানরাই আমার পৃথিবী'
খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে আহত মেয়ে ইমানের বিছানার কিনারায় বসে হানান তখনো হতভম্ব। তিনি বলেন, 'যুদ্ধবিরতি কোথায়?'
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ভাঙাচোরা বাড়িতে ফেরা হচ্ছে - এমন উত্তেজনায় পরিবারটি রোববার সকালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘোষণা শুনতে পাননি। ঘোষণায় নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, প্রথম দিন যে তিন ইসরায়েলি জিম্মিকে হামাস ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের নাম হাতে না আসা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে না। এই পরিবারটি হামাসের ব্যাখ্যাও শুনতে পায়নি। শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
হানান আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এখন তাকে স্বামী ছাড়া এবং দুই সন্তান ছাড়া জীবন কাটাতে হবে। এর মধ্যে আলাদা করে বারবার মনে পড়ছিল পরিবারের ছোট মেয়ের কথা। হানান বিলাপ করছিলেন, 'সামা ছিল সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে আদরের। যখনই আমি আরেকটা সন্তান নেওয়ার কথা বলতাম ও তখনই রেগে যেত।' আর আদলি ছিল ‘ভরসার কেন্দ্র’। সন্তানরাই ছিল হানানের দুনিয়া।
হানান বলছিলেন, বাস্তুচ্যুতি ও বোমাবর্ষণের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আমরা পুরো যুদ্ধ সহ্য করেছি। আমার সন্তানরা ক্ষুধা, খাদ্য ঘাটতি আর জরুরি জিনিসপত্রের অভাব মোকাবেলা করেছে। আমরা এই যুদ্ধের এক বছরেরও বেশি সময় বেঁচে ছিলাম, শেষ মুহুর্তে তাদের হত্যা করা হল, এটা কীভাবে হতে পারে?
ইসরায়েলের শেষবেলার হামলায় এক মুহূর্তেই পরিবারের আনন্দ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে যায়। পরিবারটি আগের রাতেও যুদ্ধবিরতি উদযাপন করেছিল।
হানানের জিজ্ঞাসা, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কি আমাদের রক্ত যথেষ্ট পায়নি? ১৫ মাস ধরে যে নির্মমতা চালাচ্ছে তা কি যথেষ্ট হয়নি?
পরক্ষণেই ভাবনায় চলে আসে ভবিষ্যৎ। স্বামী আর তার দুই সন্তানকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। 'আর কী বাকি আছে?' - মুখ দিয়ে অশ্রু নেমে আসছিল আর জিজ্ঞাসা করছিলেন হানান।
