চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় খাদ্য ঘাটতি ক্রমশ বাড়ছে। ঐ পাঁচ জেলায় বছরে খাদ্যের চাহিদা ৩১ লাখ ৩২ হাজার ২৮ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন আর এর বিপরীতে উৎপাদন ২৮ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন । চট্টগ্রাম জেলায় বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টনের বিপরিতে ফসল উৎপাদন হচ্ছে ৭ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সেচ সুবিধা বাড়ানো নিয়ে চলমান প্রকল্পের ধীরগতি ও পর্যাপ্ত প্রকল্প গ্রহণ না করায় বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি আবাদের বাইরে রয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলা নিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল গঠিত। আউশ, আমন ও বোরো ধান তিন মৌসুমে উৎপাদন হয়। এর বাইরে গম ও ভুট্টার আবাদও হয়ে থাকে । জনপ্রতি দৈনিক ৪৫৩.৬ গ্রাম খাদ্য চাহিদা ধরা হয়। গত পাঁচ বছরের খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদার পরিসংখ্যান মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাঁচ জেলায় জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৬৮২ জন। খাদ্যের চাহিদা ছিল ৩১ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৭ মেট্রিক টন। তার বিপরিতে উৎপাদন (চাল, গম, ভুট্টা) হয়েছে ২৮ লাখ ৯ হাজার ৬৩০ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩১ লাখ ৪৮ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরিতে উৎপাদন হয়েছে ২৮ লাখ ১৫ হাজার ২১৪ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১ লাখ ৩৩ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরিতে উৎপাদন হয়েছে ২৭ লাখ ৪২ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩১ লাখ ১৪ হাজার ৪৩৭ মেট্রিক টনের বিপরিতে উৎপাদন ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন । ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৯৪২ মেট্রিক টনের বিপরিতে উৎপাদন ২৫ লাখ মেট্রিক টন ।
পাঁচ জেলার মধ্যে খাদ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম জেলায়। আবার খাদ্য ঘাটতিও বেশি এই জেলাতেই । ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক ১৪ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮ মেট্রিক টনের বিপরিতে ফসল উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৮০ হাজার ৪৯৯ মেট্রিক টন । জেলায় জনসংখ্যা ৯২ লাখ ৭২ হাজার ১৬১ জন । পাঁচ জেলার মধ্যে বোরো উৎপাদন বেশি হয় নোয়াখালী জেলায় । ভুট্টা উৎপাদন বেশি হয় নোয়াখালী জেলায় ।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, খাদ্য উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয় করা গেলে খাদ্য উৎপাদন আরো বাড়ানো যাবে। যত্রতত্র শিল্প কারখানা ও বাড়িঘর নির্মাণের কারণে ফসলি জমি কমে যাচ্ছে। সাগরের পানিতে লবণাক্ততার কারণে বোরো আবাদ ব্যাহত হচ্ছে । বেড়িবাঁধ দিয়ে বোরো এলাকায় নোনা পানি প্রবেশ ঠেকাতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপ- পরিচালক কৃষিবিদ ওমর ফারুক বলেন, 'উৎপাদন বাড়াতে হলে খাল খনন করে সেচ সুবিধা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এই কাজ করে থাকেন। মহানগরীতে আবাদি জমি না থাকায় খাদ্য ঘাটতি বেড়েছে। আমরা কৃষকদের শষ্য উৎপাদন বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছি।'
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, 'খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে গেলে আবাদের বাইরে যেসব জমি রয়েছে তা আবাদযোগ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে ভরাট ও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া খাল পুনর্খনন, নতুন খাল খনন ও পাম্প হাউজ স্থাপনের মাধ্যমে সেচ সুবিধা বাড়াতে হবে। উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ফসল চাষাবাদ করতে হবে। কৃষি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে শিল্প কারখানাসহ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে । বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধ পানি নিষ্কাশনে ব্যবস্থা নিতে হবে।'
খাল খনন, পুনর্খনন ও পাম্প হাউজ নির্মাণের মাধ্যমে সেচ সুবিধা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের আলাদা সেচ বিভাগ রয়েছে । এই বিভাগের চট্টগ্রাম অঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়ানো নিয়ে কয়েকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে । অনেক নদী ও খালে বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে । সংশ্লিষ্টরা জানান, চলমান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে অনেক জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে । কিন্তু প্রকল্পের কাজে ধীরগতির কারণে এর বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে । প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে এমনটি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে । বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন সেবা বিভাগের চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী ফাতেমা বেগমও প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে কোনোকিছু জানাতে পারেননি ।
