জলবায়ুর পরিবর্তন ও জনসৃষ্ট সমস্যা

উপকূলে ডিম দিতে আসা মা-কাছিমের মৃত্যুর মিছিল

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:০০

কক্সবাজার সমুদ্রোপকূলকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমানে ভোগছে মানুষ ও প্রাণিকুলকে। দুতিন দশক আগের কক্সবাজার উপকূল এখন অনেকাংশে বদলে গেছে। বদলেছে জীবনাচার ও প্রাণ-প্রকৃতি। নদী ও সমুদ্রতীর ভাঙনের কবলে পড়ে আবাস হারিয়েছে অসংখ্য মানুষ। আর গতিপথ পরির্তন, চর জাগার ফলে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীদের। পুরোনো রীতি পরিবর্তনের ফলে স্থান পরিবর্তন করেছে মত্স্যও। তবে, বেঁচে থাকার তাগিদে উপকূলের কাছাকাছি ক্ষুদ্র ও মাঝারি নৌযানে নামছে জেলের দল। প্রতিযোগিতামূলক বসানো জালে প্রজননের প্রয়োজনে সমুদ্রতীরের বেলাভূমিতে আসার পথে আটকা পড়ছে সাগরের ‘ক্লিনার’ হিসেবে পরিচিত অসংখ্য মা-কাছিম।

গত সপ্তাহে কক্সবাজার সমুদ্রোপকূলের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক মা-কাছিমের মরদেহ উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিওআরআই-বোরি)। সৈকতের টেকনাফ, উখিয়া, রামুর হিমছড়ি, কক্সবাজার পৌরসভার নাজিরারটেক বেলাভূমিতীর থেকে মৃত কাছিমগুলো উদ্ধার করা হয় বলে জানায়, বোরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিমুল ভূঁইয়া ।

তিনি বলেন, স্থানীয়রা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় কচ্ছপের মরদেহ পড়ে় থাকতে দেখে বোরিতে খবর দেন। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করি। কাছিমগুলো জলপাই রঙের বা অলিভ রিডলি প্রজাতির। মরদেহগুলো সুরতহাল করার পর বালিচাপা দেওয়া হয়েছে।

বোরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিমুল ভূঁইয়া জানান, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা চার দিন সৈকতের টেকনাফের সাবরাং জিরো পয়েন্ট থেকে উখিয়া উপজেলার রূপপতি, সোনার পাড়া, পেঁচারদ্বীপ ও হিমছড়ি পর্যন্ত স্থান থেকে ৭০টি মৃত কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। ২৮ জানুয়ারি এক দিন বিরতির দিয়ে ২৯ জানুয়ারি শেষ দফার অনুসন্ধানে নাজিরারটেক থেকে পেঁচারদ্বীপ-মংলাপাড়া পর্যন্ত স্থান থেকে আরো ১৪টি মৃত কাছিম পাওয়া যায়।

তিনি জানান, ‘বোরির পাঁচ সদস্যের গবেষণা দল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে সার্ভে সম্পন্ন করে। গবেষক দলের উদ্ধার কাছিমের বেশির ভাগ ছিল অলিভ রিডলি বা জলপাই রঙা সামুদ্রিক কচ্ছপ। অধিকাংশের পেটে ছিল ডিম। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পর কচ্ছপগুলো বালি চাপা দেওয়া হয়েছে। সব কাছিম সম্প্রতি মারা গেছে এমন নয়। দুই মাস আগে মারা গেছে এমন কচ্ছপও রয়েছে। আমরা অনেকগুলোর কঙ্কাল পেয়েছি। গত ২৪ দিনে শতাধিক মৃত কাছিম ভেসে এসেছে।’

শিমুল ভূঁইয়া বলেন, ‘গত ২০২৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে কক্সবাজার সমুদ্রোপকূলের বিভিন্ন পয়েন্টে ২৯টি মৃত কচ্ছপ পাওয়া গিয়েছিল। প্রজনন মৌসুমে এবার এতসংখ্যক কচ্ছপের মৃত্যু ভাবিয়ে তুলেছে গবেষকদের। এভাবে কচ্ছপের মৃত্যু, তাদের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বোরির তথ্যমতে, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন মৌসুম। এ সময় মা-কচ্ছপ উপকূলে ডিম পাড়তে আসে। তখন অনেক কচ্ছপ উপকূলে বসানো জেলেদের জালে আটকে এবং সমুদ্রে চলাচলকারী নৌযানের ধাক্কায় মারা যায়। এর পরও তদন্তের পর কচ্ছপগুলোর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে।

সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্রোপকূলের সোনাদিয়া, হিমছড়ি, সোনারপাড়া, ইনানী ও টেকনাফ সৈকতে অন্তত ২৯টি মৃত কচ্ছপ পাওয়া গিয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে তিনটি মৃত ডলফিনও ভেসে এসেছিল।

পরিবেশবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উই ক্যান কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী ওমর ফারুক জয় বলেন, প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে মৃত কচ্ছপ পাওয়া যাচ্ছে। এসব কচ্ছপের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকে। সাগরে পুঁতে রাখা মাছ ধরার জালে আটকা পড়লে জেলেরা লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে কচ্ছপকে হত্যা করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে। জোয়ারের পানিতে তা উপকূলে ভেসে এলে কুকুর খেয়ে ফেলছে। জেলেদের সচেতন করা, ডিম দেওয়ার স্থানটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং সৈকতে কুকুরের বিচরণ রোধ করা জরুরি, তা না হলে কচ্ছপ রক্ষা করা যাবে না।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলের প্রকৃতির পরিবর্তন হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে পুরোনো অনেক গ্রাম। আবার অনেক জায়গায় চর জেগে পালটে গেছে নদীর গতিপথ ও উপকূলের তীর। ডিম দিতে তীরে আসার পথে জেলেরা অনেক সময় ঝামেলা মনে করে বাঁশ, কাঠ, লোহাসহ বিভিন্ন কঠিন পদার্থ দিয়ে অনেক কাছিম হত্যা করে। পরে মৃত কাছিমগুলো ঢেউয়ের তোড়ে উপকূলে ভেসে আসে। এসব নিয়ন্ত্রণে বোরি এবং মত্স্য কর্মকর্তাদের নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গত বছরও প্রজনন মৌসুমের এ সময়ে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট মৃত মা-কচ্ছপ ভেসে এসেছিল। তবে গত বছরের তুলনায় এবার মারা পড়ার হার অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এনএন