অবৈধ ইটভাটায় তীব্র বায়ুদূষণের কবলে যশোর

জোরদার হয়েছে অভিযান 

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৯:০৯

ইটভাটাসহ অন্যান্য দূষণে যশোরের বায়ুর গুণমান আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ বায়ুদূষণ মনিটরিং সেলের তথ্য অনুযায়ী বায়ুর গুণমানের সহনশীল মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে মাইক্রোগ্রামে ২ দশমিক ৫ পিএম হলেও জেলায় এই মাত্রা ২৫৮। বায়ুদূষণের জন্য মূলত অবৈধ ইটভাটাকে দায়ী করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, জেলার মোট ১৪৬টি ইটভাটার মধ্যে বৈধ কেবল ৩০টি। এদিকে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর । গুঁড়িয়ে দিচ্ছে অবৈধ ভাটা। জরিমানা করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তর ২০০১ সালে দেশের সকল ইটভাটাকে উঁচু চিমনিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। দুই-তিন বছরের মধ্যে ইটভাটামালিকরা ভারত থেকে দক্ষ কারিগর এনে তা সম্পন্ন করেন। ২০০৮ সালে আবার কাঠ কয়লার পরিবর্তে সম্পূর্ণ জিগজ্যাগ ভাটায় রূপান্তরের আইন করা হয়।

সর্বশেষ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০১৯-এ পাঁচটি স্থানে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে বিশেষ কোনো স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান হতে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে, সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা হতে দুই কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করতে পারবে না বলে আইনে উল্লেখ করা হয়। এতে উৎপাদনে থাকা ইটভাটাগুলো বিড়ম্বনায় পড়ে। এই আইন প্রয়োগে যশোরের পরিবেশ অধিদপ্তর তিন মাস আগে কঠোর অবস্থান নেওয়া শুরু করে।

এর মধ্যে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে জানুয়ারি মাসে ১৩টি এবং নভেম্বর মাসে আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে আটটিতে কাঁচা ইট ও কিলন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আংশিক ভাঙা হয় ১১টির, একটি ভাটার চিমনি ভেঙে কার্যক্রম বন্ধ এবং অপরটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এসব অভিযানে ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

এদিকে অভিযান চলাকালে অনেক বিড়ম্বনার মধ্যেও পড়তে হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বিভাগীয় শহর খুলনা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আনতে হয়। জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত জনবল মেলে না। রয়েছে অধিদপ্তরের নিজস্ব জনবলেরও সীমাবদ্ধতা। গত ১৬ জানুয়ারি মণিরামপুরের মেসার্স গোল্ড ব্রিকস-৩ ভাঙার উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযানে গেলে স্থানীয় ৪০০-৫০০ মানুষ ভাটা এলাকায় জড়ো হয়ে বাধা দেয়। এতে সম্পূর্ণ না পেরে ভাটা আংশিক ভাঙা এবং সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বেশ কিছু অভিযানে গিয়ে হাইকোর্টের আদেশে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। এর মধ্যে ৪৫টি রিট মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে অবশ্য ১৯টি নিষ্পত্তিও হয়েছে, ২৪টির জবাব দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুতই নিষ্পত্তি করে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।

নতুন আইন প্রসঙ্গে যশোর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি কাজী নজীর আহম্মেদ মুন্নু বলেন, আমাদের ইটভাটার ব্যবসা অনেক পুরোনো। সব কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স গ্রহণ এবং নবায়ন করেই আমরা ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত নিয়ম মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। কিন্তু নতুন আইনের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র না দেওয়ায় জেলা প্রশাসক লাইসেন্স দিচ্ছেন না।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান মারাত্মক সংকটে পড়েছে। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়েছে। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় চেয়েছি। এই সময়ের মধ্যে আমরা আমাদের ইটভাটার ব্যবসা থেকে সরে আসব।

পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, গত নভেম্বরে আমরা ইটভাটা মালিকদের সঙ্গে সভা করে জানিয়ে দিয়েছি, অবৈধ ইটভাটা আমরা আর চালাতে দেব না । এরপর থেকেই আমরা অভিযান শুরু করেছি।

ইত্তেফাক/এসএএস