বিগত সরকারের আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের মানুষ গত কয়েক বছর ধরে চরম মূল্যস্ফীতির স্বীকার হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভুগেছে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে। মূলত এটা শুরু হয়েছে চার-পাঁচ বছর আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকে। তখন এটা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। এরপর গত দুই বছর ডলারের এক্সচেঞ্জ রেটের কারণে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়েছে। এর মূল কারণ, আমাদের রিজার্ভ কমতে ছিল। অন্যদিকে প্রচুর টাকা পন্ডার হয়েছে। যার করণে ডলার ডিমান্ডও বেড়েছে। রেপো রেট এ সময় ছিল ৫ কিংবা সাড়ে ৫। সেটা বাড়তে বাড়তে সাড়ে ৮ শতাংশে নিয়ে আসছে। কিন্তু সে তুলনায় মূল্যস্ফীতি কমেনি।
মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণগুলো হলো: জ্বালানির মূল্য বাড়ানো, রাশিয়ার-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, ডলারের দাম বৃদ্ধি, টাকার মূল্য কমে যাওয়া, রিজার্ভ কমে যাওয়া, প্রচুর পরিমাণ টাকা পাচার হওয়া, চাহিদার তুলনায় বাজারে পণ্যের সরবরাহ কম হওয়া ইত্যাদি। গত দুই বছরে টাকার মূল্য বড় রকমের কমে যাওয়ার ফলে আমদানি খরচ বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে পণ্যের দামে। কিন্তু এর সঙ্গে সংগতি রেখে বিগত সরকার আমদানি গুল্ক সামঞ্জস্য করেনি। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও বিতরণের খরচ বেড়ে গেছে, যা সামগ্রিকভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে প্রভাব রেখেছে। বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবের কারণে মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। উক্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, যা তখনকার সরকার আমলে নেয়নি।
বিগত সরকারের সময় ব্যাংক খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে ঋণখেলাপিদের দিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষার জন্য সরকার নির্বিচারে টাকা ছাপিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুন মাসে দেশে প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। আর ২০২৩ সনের জুন মাসে প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১১ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকায়। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর জন্যই মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে ২০২২ সালে। সে বছরের আগস্টে তা পৌঁছায় সর্বোচ্চ (৯.৫২%)। তার পর থেকে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে।
২০১৪ সালের জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৬৬ শতাংশে, যা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ। এই মূল্যস্ফীতির অনেকটাই আসে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ মূল্য থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২-২৩ অধর্থবছরে রেপো রেট এবং রিভার্স রেপো রেট দুই দফায় বাড়িয়ে নিজেদের মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রচেষ্টা করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও গত সরকারের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত একই ধারায় রেপো রেট এবং রিভার্স রেপো রেট একাধিক ধাপে বাড়িয়ে ৮.৫০ শতাংশে আনা হয়। দুবছর আগে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সে সময় মুদ্রা সরবরাহও বেড়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্বের কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূ্ল্য বেড়েছে। অন্য দেশগুলো যথাসময়ে নীতি গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নকে সফলভাবে মোকাবেলা করেছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সরকারের সিকিউরিটিজ কেনে, অর্থাৎ সরকারের বাজেটের ঘাটতি পূরনে সহায়তা করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল প্রাইভেট ব্যাংকগুলোকে নগদ অর্থের সংকট থেকে উদ্ধারে আবারও টাকা ছাপায়।। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের বিদ্যুৎ ও সার বন্ডের বিপরীতে আবার টাকা ছাপায়। দেশের সম্পদ বৃদ্ধির ভিত্তি ছাড়া এভাবে বারবার টাকা ছাপানোর কারণে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে। এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে প্রয়োগকৃত অন্য নীতিগুলোর বিপরীতে কাজ করেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্যের মুল্যবৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতির কারণ। ডলারের বিনিময় মূল্য গত দুই বছরে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং কোভিড-১৯ লকডাইন ওঠানোর পর বৈশ্বিকভাবে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পায়, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করে। ডলারের উচ্চ বিনিময় আর আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাঁদাবাজি বন্ধের পাশাপাশি মজুতদার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারেন। এছাড়া, বাজার নিয়ন্ত্রনের জন্য প্রতিযোগিতা কমিশনকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তবে মাঝেমধ্যে দেখা যায়, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য সরকার এবং নানা গণমাধ্যম তথাকথিত সিন্ডিকেটকে দায়ী করে। তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে বেশকিছু পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে লাখ লাখ কৃষক জড়িত। সেক্ষেত্রে এটা বলল যুক্তিযুক্ত নয় যে, এসব কৃষক সিন্ডিকেট তৈরি করছে। আমার মনে হয়, বাজার পর্যবেক্ষণের জন্য সরকার অর্থনীতিবিদদের নিয়োগ দিতে পারে। কেউ মূল্য নিয়ে খেলছে কি না তা তারা দেখতে পারেন। দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে অর্থনীতিবিদরা বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন বাজরে ঘাটতির কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে নাকি কেউ ইচ্ছা করে দাম বাড়িয়েছে।
তবে এখন শুধু মূল্যস্ফীতির ইস্যুটা ছাড়া আমাদের অর্থনীতি ভালোর দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলতে চাচ্ছে, জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এখন আমাদের রিজার্ভ বাড়বে, কারণ, এক্সপোর্ট বাড়ছে, রেমিট্যান্স আসছে। এসবের ওপর নির্ভর করে আমাদের টাকার মান ধয়ে রাখতে হবে। আমি মনে করি, সুদের হার কমানো উচিত। তাহলে ব্যবসায়ীরা উৎসাহ পাবে। দেশে দুই-তিন বছর ধরে কোনো বিনিয়োগ হচ্ছে না। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে সাপ্লাই সাইটটা জেগে ওঠে। সাপ্লাই বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি কমে যাবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, চেয়ারম্যান
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)
অনুলিখন: দুয়া রায়হান

