চিকিৎসকদের কোনো চেষ্টাই কাজে এলো না। শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেল না মাগুরায় ধর্ষণের শিকার আট বছরের শিশুটিকে। ছোট্ট শরীর আর হূদয়ে অনেক ক্ষত নিয়ে নীরবে চলে গেল সে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর। এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
মাগুরা শহরতলির নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে গত ৬ মার্চ শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়। সেই খবরে সারা দেশে তৈরি হয় ক্ষোভ। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সেই থেকে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মিছিল, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি চলছে। গতকালও দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ হয়েছে।
শিশুটির মা গত ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় চার জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন শিশুটির ভগ্নীপতি সজীব হোসেন (১৮), বোনের শ্বশুর হিটু মিয়া (৪২), সজিব শেখের বড় ভাই রাতুল শেখ (২০) এবং তাদের মা জাবেদা বেগম (৪০)। এদের চার জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সজীবের সহায়তায় তার বাবা হিটু মিয়া শিশুটিকে ‘ধর্ষণ’ করেন। বিষয়টি জাবেদা ও তার বড় ছেলেও জানতেন। ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিশুটিকে হত্যার চেষ্টাও চালান তারা।
নির্যাতনের শিকার শিশুটিকে প্রথমে মাগুরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে নেওয়া হয় ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ৬ মার্চই তাকে ঢাকা মেডিক্যালের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) ভর্তি করা হয়। পরে গত শুক্রবার রাতে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যালের চিকিৎসকরা শনিবার জানিয়েছিলেন, শিশুটির অবস্থা ‘সংকটাপন্ন’। তার চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হলেও ঐ দিন সন্ধ্যায় শিশুটিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল-সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই মারা যায় শিশুটি।
গতকাল সকালে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক বার্তায় বলা হয়, ‘আজ (শুক্রবার) সে আরো দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয় বার প্রায় ৩০ মিনিট সিপিআর দেওয়ার পর হূৎস্পন্দন ফিরেছে, তবে তার মস্তিষ্ক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। কোমা স্কেলে (জিসিএস) মাত্রা ৩, যা গভীর অচেতন অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। শিশুটির রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রাও বিপজ্জনকভাবে কম।’ এরপর দুপুরে শিশুটির মৃত্যুর খবর দেয় আইএসপিআর।
সেনাবাহিনীর তরফে শোক প্রকাশ করে আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) সর্বাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োগ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শিশুটির গতকাল সকালে তিন বার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে, দুই বার স্থিতিশীল করা গেলেও তৃতীয় বার আর হূদস্পন্দন ফিরে আসেনি।’
শিশুটির মা বলেছেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে যারা খারাপ কাজ করেছে তাদের ফাঁসি চাই।’ গতকাল ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) সামনে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এই দাবি জানান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সিএমএইচ থেকে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি মাগুরা নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে মেয়েকে দাফন করা হবে। আর আমার মেয়ের সঙ্গে যারা খারাপ কাজ করেছে তাদের ফাঁসি চাই।’
কেউ সান্ত্বনা দিতে কাছে গেলে শিশুটির মা বলেন, ‘কখনো কখনো মনে হয়েছে মেয়েটা সুস্থ হবে। এবার বেঁচে গেলে আর কখনো বাড়ি থেকে একা ছাড়তাম না। কিন্তু আল্লাহ ডাক শোনেননি।’ স্বজনদের জড়িয়ে ধরে চিত্কার করে বলেন, শেষ বারের মতো মা বলে আর ডাকল না তাকে। মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন শিশুটির প্রতিবন্ধী বাবাও। তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। এর মধ্যেই তিনি ‘ধর্ষকের গোটা পরিবারসহ’ সবার ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে অঝোরে কাঁদতে দেখা গেছে শিশুটির বড় বোনকেও।
এদিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে এ ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।
মামলার এজাহারে শিশুটির মা বলেন, গত ৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে খাবার খেয়ে বড় বোন ও তার স্বামীর সঙ্গে একই কক্ষে ঘুমায় শিশুটি। রাত আড়াইটার দিকে বড় বোন ঘুম থেকে জেগে দেখেন, ছোট বোন পাশে নেই, মেঝেতে পড়ে আছে। তখন শিশুটি বড় বোনকে জানায়, তার যৌনাঙ্গে জ্বালাপোড়া হচ্ছে। কিন্তু বড় বোন মনে করে, শিশুটি ঘুমের মধ্যে আবোলতাবোল বকছে। এরপর সকাল ৬টার দিকে শিশুটি আবার বোনকে যৌনাঙ্গে জ্বালাপোড়ার কথা বলে। কারণ জিগ্যেস করলে সে বোনকে জানায়, রাতে দুলাভাই (সজীব) দরজা খুলে দিলে তার বাবা (হিটু শেখ) তার মুখ চেপে ধরে তার কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন। সে চিত্কার করতে গেলে তার গলা চেপে ধরা হয়। পরে তাকে আবার বোনের কক্ষের মেঝেতে ফেলে রেখে যায়।
শিশুটির বড় বোন বলেন, ‘২০ দিনের মতো আগে আমার সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটে। সেদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে কেউ ছিল না। আমি ঘরে আলো জ্বালিয়ে টয়লেটে যাই। টয়লেট থেকে ফিরে দেখি ঘরে আলো বন্ধ। হঠাত্ করে একজন আমার পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। আমি উচ্চতা ও অন্যান্য বিষয় দেখে বুঝতে পারি, সে আমার শ্বশুর। বিষয়টি আমার স্বামীকে জানালে সে উলটো আমাকে আজেবাজে কথা বলে। আমি আমার বাড়িতেও এ কথা জানাই। বাড়িতে গিয়ে আর শ্বশুরবাড়ি ফিরতে চাইনি। কিন্তু বাড়ি থেকে আমাকে বুঝিয়ে আবার পাঠানো হয়। আমার ভেতর সব সময় ভয় কাজ করত, যদি ঐ ঘটনার চেয়ে খারাপ কিছু ঘটে। এ কারণে আমার সঙ্গে আমার ছোট বোনকে পাঠায়।’
