বাংলাদেশে ধর্ষণ এখন একটি ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে ধর্ষণের শিকার নারীদের হৃদয়বিদারক গল্প উঠে আসছে। শিশু থেকে বৃদ্ধা-কেউই এই বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা শান্তির আওতায় আসছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অবক্ষয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ফলে ধর্ষণ এখন এক মহামারির রূপ নিয়েছে।
প্রতিদিন ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার শিরোনামে কোনো না কোনো নারীর প্রতি অবর্ণনীয় সহিংসতার কথা উঠে আসে। এটি শুধু ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার এক চরম অবক্ষয়ের প্রতিচিত্র।
বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি কঠোর হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ একেবারেই অপ্রতুল। ধর্ষণের মামলা বছরের পর বছর আদালতে পড়ে থাকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। অপরাধীর সাজা নিশ্চিত না হওয়ায় সমাজে এক ধরনের ভীতি ও অনিরাপত্তার বোধ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে যখন কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা তার আশ্রিতরা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকে, তখন বিচার পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েই যাচ্ছে। গত ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশে অন্তত ৬ হাজার ৩০৫ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৭১ জন ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু রয়েছে। চলতি বছরের গত দুই মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ১০৭ জন, যাদের মধ্যে ৬৬ জন ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু রয়েছে। এ সময় ২২৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিজস্ব অনুসন্ধানে এসব তথ্য সংগ্রহ করে। বাংলাদেশে ধর্ষণ সংঘটিত হওয়ার নানাবিধ কারণ আছে বলে মনে করা হয়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
১. ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। মামলাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, ফলে সহজেই ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পায় না।
২. আমাদের সমাজে এখনো নারীদের পোশাক, চলাফেরা বা আচরণকে ধর্ষণের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়।
৩. পর্ণোগ্রাফির সহজলভ্যতাও অনেক সময় বিকৃত মানসিকতার জন্ম দেয়।
৪. অধিকাংশ অপরাধী রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে পার পেয়ে যায়।
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করা এবং নারীদের আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তাই এটি রোধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে: ১. মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ২. রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব থাকলেও অপরাধীদের ছাড় দেওয়া যাবে না। ৩. পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রতি সম্মান ও সমানাধিকারের শিক্ষা দিতে হবে। ৪. শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ৫. ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যাতে কেউ অপরাধ করে পার না পায়। ৬. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
বর্তমানে ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমাজের এক গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার, আদালত, পরিবার-সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। শাস্তির ভয়, সামাজিক সচেতনতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাই পারে এই ব্যাধির সমাপ্তি ঘটাতে। অন্যথায়, আমরা সবাই এক অনিরাপদ সমাজের বাসিন্দা হয়ে থাকব। এখনই সময় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
