একটি রাষ্ট্র কখনো দৃশ্যমান শত্রুর আবার কখনো-বা অদৃশ্যমান শত্রুর কবলে পড়ে। কূটনৈতিক কৌশল, সামরিক-বেসামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলার চেষ্টা করে। কখনো বিজয়ী কখনো পরাজিত হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ, ফলাফল ও প্রভাব অজানা কিংবা অদৃশ্যমান নয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ নিয়ে নানা শিবিরে বিভক্ত বোদ্ধারা। সুপেয় পানি, আধিপত্য কিংবা অন্য যা-কিছুই কারণ হোক না কেন, পারমাণবিক প্রযুক্তি কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব যে শতভাগ প্রভাবিত করবে, তা অমোঘ সত্য। পুরো বিশ্ব কৌশলে নেতিবাচক মহাসড়কের একই রথযাত্রায় দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ধ্বংস হওয়ার ইতিহাস বিমূঢ়। তবে ভুল, বিকৃত, মিথ্যা তথ্যসংবলিত কনটেন্টের মাধ্যমে কীভাবে একটি সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বের ছাত্র-যুবরা বা অসচেতন সমাজের একটি বড় অংশ আসক্তির বেড়াজালে গোচরে-অগোচরে বিপথগামী কিংবা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা দেখার জন্য দূরদর্শী বা বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি নয়।
সঠিক বার্তা-সংবলিত একটি কনটেন্ট দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পৃথিবীর এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া খবর অন্য প্রান্ত থেকে মানুষ সহজে স্বল্প সময়ের মধ্যে জানতে পারে। ইন্টারনেট তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আশীর্বাদে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আজ বিশ্বগ্রাম (Global Village)-এ রূপ ধারণ করেছে। তবে ভুয়া কনটেন্ট বা খবর তেজি ঘোড়ার মতো দৌড়ায়। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজ বা রাষ্ট্র বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। লক্ষ-কোটি ভিউয়ার। প্রচুর টাকা উপার্জনের সহজ পন্থা, মোক্ষম হাতিয়ার। নেতিবাচক বার্তার খবর মানুষ গ্রহণ করে বেশি। কারণ এতে সত্য-মিথ্যের রসবোধে মানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তবে সে নেতিবাচক বার্তার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার বালাই নেই কনটেন্ট তৈরিতে। সাংবাদিতার ভাষায় ‘ফ্যাক্ট চেক’ শব্দে কনটেন্ট ক্রিয়েটর কিংবা দর্শকরা অভ্যস্ত নয়। ডিজিটাল ডিভাইসে একটি সত্য সংবাদ যত দ্রুত ছড়ায়, অসত্য বা মিথ্যা সংবাদটি তার চেয়ে কয়েক শ গুণ বেশি দ্রুত ছড়ায়। দর্শকের মান আর কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মান বা যোগ্যতা বা দক্ষতা খুব বেশি ব্যবধান নেই। সনদধারী ব্যক্তিরাও এসব কনটেন্ট দেখে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুনেছি। আরো বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে, খোলামেলা যৌনতা বিষয়ে ছোট ছোট অজস্র কনটেন্ট ফেসবুক কিংবা ইউটিউব খুললেই সামনে চলে আসে। খোঁজার প্রয়োজন হয় না। যা সামাজিক অবক্ষয়কে অতিমাত্রায় ত্বরান্বিত করছে বইকি। ব্ল্যাক মেইলিং, সাইবার ক্রাইম, বুলিং নিয়মিত অধ্যায়।
মিথ্যা, অসম্পূর্ণ, বিকৃত তথ্যসংবলিত তৈরিকৃত কনটেন্ট ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রামে সয়লাব। ব্যবহারকারীরা বুঝতেই পারে না, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। যখন বুঝতে পারে, ততক্ষণে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। অনেকে আবার বোঝার চেষ্টাও করে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা হয়। তবে প্রায় শতভাগ শিক্ষিত দেশের নাগরিক এসব বিষয়ে আমাদের দেশের নাগরিকদের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। বর্তমান নীতিমালায় বিশ্বের সব দেশের কিংবা কোনো বিশেষ এলাকার তথ্য ফেক্ট চেক করা ইউটিউব কর্তৃপক্ষের দ্বারা পুরোপুরি সম্ভব নয়। ইউটিউবের ইউটিউবের প্রধান সুসান ওজস্কিকে এ বিষয়ে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে বিশ্বের অনেকগুলো দেশ, প্রতিষ্ঠান। সবার অনুরোধ হচ্ছে, প্রতিদিনই ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয়ে ভুয়া তথ্য ছাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে, যেসব দেশের ভাষা ইংরেজি নয়। যারা ইংরেজি ভাষায় কনটেন্ট তৈরি করে না, তারাই ভুয়া তথ্য বেশি ছাড়ায়। ইংরেজি ব্যতীত অন্যান্য ভাষায় তৈরি কনটেন্ট বুঝতে না পারায় মুছে দিতে অক্ষম কর্তৃপক্ষ। বিশেষভাবে অনুরোধক্রমে কর্তৃপক্ষ অনেক সময় ভুয়া কনটেন্ট মুছে দেয়। সব দেশের সব অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি, ঘটনাপ্রবাহগুলো ফেক্ট চেক করার জন্য ইউটিউব কর্তৃপক্ষ কতটুকু সক্ষম? তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে ভুয়া, মিথ্যা তথ্যের বিকৃতির মাধ্যমে প্রতিনিয়তই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিক, সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিব্রত, বিপর্যস্ত, প্রতারিত, অসম্মানিত, হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছে। ভিআইপিদের মৃত্যুর খবর, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, বাজারদর, সাম্প্রতিক ইস্যু নিয়ে অসংখ্যক ভুয়া, মিথ্যা কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সয়লাব। যুদ্ধক্ষেত্রে গুজব ছড়াতে, উসকানি দিতে অশেষ দায়িত্ব পালন করছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে পার্বত্য অঞ্চলে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ভুয়া কনটেন্টের ভূমিকা কারো অজানা থাকার কথা নয়। ইউটিউবের অ্যালগরিদম এক্ষেত্রে মিথ্যা কনটেন্ট শনাক্তকরণে কতটুকু সক্ষম বা সফল, তা বর্তমান পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে। মূলত, নীতিবিবর্জিত লোকজনকে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ প্ল্যাটফরমটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক স্বীকৃত বাংলাদেশের অন্যতম ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার ২০২৪ সালে ২ হাজার ৯১৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯১৫টি। এক বছরের ব্যবধানে ভুল তথ্য ছড়ানোর হার বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। উল্লেখ্য যে, প্রকাশিত বা প্রচারিত সব ভুয়া তথ্য উক্ত প্রতিষ্ঠানটি যাছাই করতে পেরেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফ্যাক্ট চেকিং করার বিষটি প্রত্যাশা করাও বোকামি। ফ্যাক্ট চেকিং নিয়ে কাজ করে, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
মানুষ স্বভাবগতভাবেই লিখিত কোনো তথ্যের চেয়ে ছোট আকারের ভিডিও দেখতে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ভিডিওতে চোখ ও মস্তিষ্কের ব্যবহার একসঙ্গে হওয়ায় অনেক বেশি মনোযোগ আকর্ষিত হয়। এছাড়া ছোট আকারের কনটেন্টগুলো দর্শকরা পছন্দ করে এবং সবচেয়ে বেশি ভিউ হয়। পক্ষান্তরে বড় কনটেন্টগুলো সবাই এড়িয়ে যেতে চায়। সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার, মেসেঞ্জার কর্তৃপক্ষ বিশ্বের সব দেশের ভাষা এবং সংস্কৃতি অনুযায়ী ফ্যাক্ট চেক কর্মকর্তা নিয়োগ কিংবা এআই (Artificial Intelligence) ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে ফিল্টারিং করে ভুয়া কনটেন্ট বা খবর বাতিল করা জরুরি। বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব ঘটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সুপার এডিটিংয়ে সৃষ্ট আকর্ষণীয় মিথ্যা কনটেন্টকে ঠেকাতে কিংবা শনাক্ত করতে সুপার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বাধিক ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয়। তাছাড়া ব্যবহারকারীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা দরকার । নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যতীত কোনো কনটেন্ট বা খবরে বিব্রত হওয়া উচিত নয়। কনটেন্ট ক্রিয়েটর থেকে শুরু করে দর্শক, ব্যবহারকারী সবার স্মার্ট লিটারেসি (Smart Literacy) বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারজ্ঞান এখন অত্যাবশ্যকীয়। এক্ষেত্রে যেসব অ্যাপসের মাধ্যমে কনটেন্ট প্রচার বা প্রকাশ করা হয়, সেসব অ্যাপসে ফিল্টারিং বা ফ্যাক্ট চেক ব্যবস্থাও অসত্য বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত তথা বাদ দেওয়ার একটি অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।
এতে করে এসব অ্যাপস ব্যবহারে সচেতন মানুষের আগ্রহ বাড়বে এবং বিশ্বস্ত ও জনপ্রিয় হবে। সম্প্রতি চীনা মালিকানাধীন জনপ্রিয় কনটেন্ট অ্যাপস টিকটক নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত তা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বিদায়ি সরকার মনে করেছে যে, এতে রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বশেষ নির্বাচনে ভোটের কথা চিন্তা করে টিকটকার পেশাজীবীদের পক্ষে একটি কৌশল এঁটেছিলেন। সেজন্য ভোটে টিকটকারদের নিরঙ্কুশ সমর্থনও পেয়েছিলেন। বর্তমানে সেটি যদি বাস্তবায়ন করতে চান, তবে নিশ্চয়ই কিছু সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোর ভেতরে এনে নাগরিকদের টিকটক ব্যবহারের পথ সুগম করবেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। যা ফ্যাক্ট চেক বা নিরাপদ কনটেন্ট কর্তৃপক্ষেরই নামান্তর হবে বলে মনে করছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারের মনিটরিং সেলগুলো এসব বিষয়ে আরো সোচ্চারের মাধ্যমে এমন দুর্বিষহতা থেকে দেশ, জাতি ও বিশ্বকে ভুয়া সংবাদপ্রবাহের বিপর্যস্ত স্রোত থেকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক :তথ্য অফিসার
