বর্তমান বাংলাদেশে যে পরিমাণ কিডনি রোগের সংখ্যা ক্রমশই বেড়েই চলছে, তা একসময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। হতদরিদ্র কিডনি রোগীদের জন্য যা মরণফাঁদ। প্রবাদ আছে :‘কিডনি রোগী মরেও যায় মেরেও যায়’! বাস্তবে আমৃত্যু চিকিত্সার ভার ধনী-মধ্যবিত্ত কিংবা হতদরিদ্র কারো নেই। কিডনি রোগী ও ভুক্তভোগী পরিবারের বোবাকান্না ও নির্মম কষ্টের আওয়াজ চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ। বর্তমান বাংলাদেশে ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত।
৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল, যারা ডায়ালাইসিস নিয়ে বেঁচে আছে। এই ব্যয়বহুল চিকিত্সার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় ৮৫ শতাংশেরও বেশি পরিবারের এবং প্রতি বছর প্রায় ১৭ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। একটি কিডনি রোগীকে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার ডায়ালাইসিস করাতে হয়, যা মাসে খরচ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তাছাড়া দেশে কিডনি রোগের ভালো কোনো চিকিত্সাব্যবস্থা নেই। বর্তমানে যে হারে কিডনি রোগী বাড়ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ লাখ কিডনি রোগী উন্নত চিকিত্সা না পেয়ে অগণিতভাবে মৃত্যুবরণ করবে। প্রাণঘাতী কিডনি রোগে বিনা চিকিত্সায় নীরবে নিঃশব্দে অসংখ্য মানুষের অকালমৃত্যুর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।
চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের মতে কিডনি বিকলের অন্যতম উপসর্গ হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচার সব রোগের উত্পত্তির মূল উত্স। কিডনি বিকল হওয়ার ফলে রক্তে সংক্রমণজনিত কারণে লিভার, ফুসফুস, হূদেরাগসহ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নানা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। এটা বংশানুক্রমিকও।
এমন প্রাণঘাতী রোগকে অবহেলা করলে তার ফলাফল পুরো জাতিকে ভুগতে হতে পারে। বর্তমান সমাজব্যবস্থা আশঙ্কাজনক মৃত্যুর হার সম্পর্কে অবগত নয়। উল্লেখ্য যে, বর্তমান সমাজব্যবস্থা একজন মানুষের মৃত্যুপরবর্তী শোকের মাতন, মেজবান এবং সামাজিক নানা আনুষ্ঠানিকতার পেছনে যে অর্থ ব্যয় করে থাকে, তার কিঞ্চিত্ পরিমাণ অর্থও যদি কিডনি রোগীদের চিকিত্সা খাতে ব্যয় করত, তাহলে অকালমৃত্যু হতো না।
প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কোম্পানিসমূহের করপোরেট দায়িত্ববোধ রয়েছে। সামাজিক এই দায়বদ্ধতা থেকেই তারা কিডনি রোগীদের সেবায় আয়ের একটা অংশ অনুদান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একটি নিরোগ সুস্থ জাতি গঠনে প্রতিটি ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক উপার্জনের একটি অংশ দান করা আইন দ্বারা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এমন মরণব্যাধি কিডনি চিকিত্সায় কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করা মানুষগুলোর পাশে রাষ্ট্রের যথোপযুক্ত পদক্ষেপ ও মানবিক সমাজের সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত না হলে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কিডনি রোগের ব্যয়বহুল চিকিত্সায় ভুক্তভোগী এবং নির্মম বাস্তবতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে অর্থাভাবে চিকিত্সাবঞ্চিত হতদরিদ্র কিডনি রোগী ও ভুক্তভোগী পরিবারের বুকফাটা বোবাকান্না ও নির্মম কষ্টের আওয়াজ সরকার, সামর্থ্যবান ও মানবিক সমাজে ছড়িয়ে দিয়ে সর্বজনীন সহযোগিতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে জীবন রক্ষার প্রয়োজন।
লেখক :আজীবনসদস্য, কিডনি রোগী কল্যাণ সংস্থা
