গাড়ি থেকে ৩৭ লাখ টাকা উদ্ধার

গাইবান্ধায় ২১ বছর ধরে কর্মরত সেই প্রকৌশলী, ঠিকাদাররাও তার কাছে জিম্মি

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৫, ১৫:৪১

নাটোরের সিংড়া উপজেলায় প্রায় ৩৭ লাখ টাকাসহ যৌথ বাহিনীর হাতে আটক গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ছাবিউল ইসলাম ঘুরেফিরে গাইবান্ধা জেলায় প্রায় ২১ বছর ধরে কর্মরত আছেন। ফলে তার প্রভাবের কারণে ঠিকাদাররা তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। 

গাইবান্ধা এলজিইডির ঠিকাদারদের অভিযোগ, ছাবিউল ইসলাম দীর্ঘ সময় একই জেলায় থাকার কারণে তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। ঠিকাদারেরা তার কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েন। ঘুষ (পারসোনাল কমিশন-পিসি) ছাড়া ফাইল সই করেন না।

গাইবান্ধা এলজিইডি ও সাঘাটা উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, মো. ছাবিউল ইসলামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। বর্তমানে তিনি রাজশাহী নগরে বিশাল বাড়ি করেছেন। তিনি বিগত ২০০৫ সালের ২১ ডিসেম্বর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে সাঘাটায় যোগদান করেন। এখানে কর্মরত থাকেন ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। এই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেন টানা ১৪ বছর ১ মাস ২২ দিন। 

এরপর জ্যেষ্ঠ সহকারি প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডি গাইবান্ধা জেলা কার্যালয়ে যোগ দেন। এখানে তিনি ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ বছর ৬ মাস ২৮ দিন দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি সাঘাটা উপজেলায় (উপজেলা প্রকৌশলী) অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। 

পরে ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ছাবিউল ইসলাম বরিশাল জেলায় যোগ দেন। সেখানে মাত্র ২৩ দিন দায়িত্ব পালন করেন। তদবির করে আবারও গাইবান্ধায় বদলি নেন। একই বছরের ৭ অক্টোবর তিনি গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। পরদিন ৮ নভেম্বর তিনি পূর্ববর্তী নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। অর্থাৎ সাঘাটায় যোগদানের পর থেকে চলতি বছরের ১৭ মার্চ পর্যন্ত ঘুরে ফিরে ২০ বছর ৯ মাস ১২ দিন গাইবান্ধা জেলায় কর্মরত আছেন। 

ঠিকাদার ও জেলা এলজিইডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাবিউল ইসলাম জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য প্রয়াত ফজলে রাব্বী মিয়ার ‘ধর্ম পুত্র’ বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর দাপটেই তিনি দীর্ঘদিন গাইবান্ধায় থাকার সুযোগ পান। ২০২২ সালের ২২ জুলাই ফজলে রাব্বী মারা গেলেও তিনি আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় এখানে কর্মরত ছিলেন। 

ছাবিউলের বিষয়টি জেনে গাইবান্ধা সনাকের (টিআইবি পরিচালিত) সদস্য সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চাকরিবিধি অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে টানা তিন বছরের বেশি থাকার কথা নয়। এক জেলায় দীর্ঘ সময় থাকায় তিনি সরকারি বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

তিনি আরও জানান, এক জেলায় ঘুরেফিরে দীর্ঘ দিন থাকার কারণে যে কোন সরকারি কর্মকর্তা সাহসী হয়ে ওঠেন। তাঁর পরিচিতি বেড়ে যায়। তিনি অনিয়ম-দুর্নীতি করার সাহস পান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাইবান্ধার একাধিক ঠিকাদার বলেন, একই জেলায় দীর্ঘদিন থাকার কারণে ওই প্রকৌশলী নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। বিশেষত ঠিকাদারেরা তাঁর কাছে জিম্মি ছিলেন। ঘুষ ছাড়া তিনি ফাইল সই করতেন না।

এলজিইডির তালিকাভুক্ত ঠিকাদার মিলন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ওই নির্বাহী প্রকৌশলী প্রথম বিল সই করার সময় শতকরা ৫ ভাগ এবং চূড়ান্ত বিল সই করতে শতকরা ১০ভাগ টাকা ঘুষ নিতেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার ও এলজিইডির এক কর্মকর্তা বলেন, এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্প নির্মাণকাজে তাঁর মনোনীত লোক দ্বারা নিকট থেকে পাথর, বিটুমিন, ইটের খোয়া ও রড ঠিকাদারদের কাছে সরবরাহ দিতেন।

গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক বিশিষ্ট আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, যে কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ঘুরেফিরে একই জায়গায় থাকেন, তার মধ্যে অসৎ উদ্দেশ্য থাকে।

এদিকে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে ছাবিউল ইসলাম বলেন, কাজ ঠিক থাকলে বিল ছাড় করা হয়। কোনো ধরনের ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ কেউ দিতে পারবেন না। 

এদিকে গাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার বিষয়ে তিনি বলেন, তার বাবা মারা যাওয়ার পর সিরাজগঞ্জের জমি বিক্রির টাকা তার চাচা দিয়ে গেছেন। সেগুলো তিনি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

সিংড়া থানার ওসি মো. আসমাউল হক জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে গাইবান্ধা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে নাটোরের সিংড়া উপজেলায় গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর গাড়ি তল্লাশি করে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা জব্দ করেন যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। ওই ঘটনায় থানায় একটি সাধারন ডাইয়েরি করা হয়। উপপরিদর্শক (এসআই) রাজু আহমেদ বিষয়টি তদন্ত করছেন। 

তদন্তকারী কর্মকর্তা সিংড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাজু আহমেদ জানান, টাকাগুলো এলজিইডির কর্মকর্তা জমি বিক্রির টাকা বলে দাবি করলেও এর সমর্থনে কোনো কাগজপত্র জমা দিতে পারেননি। তাই টাকার বৈধতা নিরূপণের জন্য তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন পাঠিয়েছেন। তারা তদন্ত করে টাকার উত্স সম্পর্কে প্রতিবেদন দেবেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ছাবিউল ইসলামের গাড়ি থেকে জব্দ করা টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ চেয়ে রোববার দুপুরে আদালতে আবেদন করা হয়। বিকেলে নাটোরের সিংড়া আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার জাহান টাকাগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার আদেশ দেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি