ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সর্বাত্মক বাণিজ্যযুদ্ধ’

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১৭:৪৪

অন্য যে কোনো আধুনিক প্রেসিডেন্টের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটু বেশিই আলাদা! মাঝেমধ্যে তিনি এমন সব কর্মকাণ্ড করে বসেন যে, দেখে মনে হয়, মার্কিন অর্থনীতির সঙ্গে তিনি যেন ‘এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জুয়া খেলা শুরু করেছেন। অবশ্য তার এই আচরণ নতুন কিছু নয়।

প্রেসিডেন্টদের প্রধান কাজ হলো, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন সচল রাখা এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়, এমন কাজ না করা বা এড়িয়ে চলা। বিশেষ করে, এ দুই ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টরা চেষ্টার খামতি না রাখতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকেন। ফলে ঐ সব দেশে বেকারত্ব সহনীয় পর্যায়ে থাকে, গতিশীল থাকে প্রবৃদ্ধির চাকা; কিন্তু ট্রাম্প এসব কী করছেন!

বিশ্বের ১৮৫টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বেশ ভালোই চলছিল! কিন্তু সম্প্রতি দেশগুলোর ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প, যা নিয়ে স্বভাবতই হইচই পড়ে গেছে বিশ্বময়। প্রায় সব ধরনের আমদানির ওপর শুল্ক চাপিয়েছেন তিনি, যা স্বভাবতই ভাবিয়ে তুলছে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। তারা প্রায় সবাই একমত যে, এ ধরনের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, গোটা পৃথিবীকেই "ইতিহাসের কিছু ভয়াবহ অভিজ্ঞতা'র সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে নতুন করে।

গত বুধবার হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে ট্রাম্প হাজির হন অনেকটা অলৌকিক ভঙ্গিতে ! এরপর উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের সামনে 'নতুন শুল্ক হার' সংবলিত প্রকাণ্ড এক পোস্টার উঁচিয়ে ধরে বাতাসে দোল খাওয়াতে থাকেন। বলা বাহুল্য, ঐ দৃশ্য দেখে মার্কিন নাগরিকরা তো বটেই, বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ হয়তো-বা এমন কথা ও বিড়বিড় করে বলেছেন যে, তারা এমন এক 'অবাধ চিন্তার অধিকারী' প্রেসিডেন্টকে দেখছেন, যিনি এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বাজি ধরে কোটি কোটি মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্যকে ফেলে দিয়েছেন ঝুঁকির মুখে।

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিস্ময় হলো, এর মাধ্যমে ট্রাম্প সম্ভবত কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা দেশের শিল্পকারখানাগুলোর নাজুক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে বলে মনে করছেন। অর্থাৎ, আমেরিকার বিধ্বস্ত শিল্পোত্তর অঞ্চলগুলোর 'অর্থনৈতিক সম্ভাবনা' পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন তিনি; কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে করে কী কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে? বরং বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যে মন্তব্য করে বলেছেন, নতুন শুল্প আরোপের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প আদতে আমেরিকানদের ওপরই 'দুর্ভোগ ও যন্ত্রণা' চাপাতে চলেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন এবং এরপর বাইডেন প্রশাসনের অযাচিত ব্যয় মার্কিন অর্থনীতিকে কাহিল করে তুলেছিল। মুদি মালামাল কিংবা আবাসনের মতো জরুরি খাতগুলোতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ে পরিবারগুলো। ভোটাররা এর জবাবও দিয়েছেন ব্যালটের মাধ্যমে!

নির্বাচনের সময় ডেমোক্রেটিক মনোনীত প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, তিনি কীভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার কমাবেন, এসব ক্ষেত্রে তিনি কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, তখন তিনি যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা যে ভোটারদের খুশি করতে পারেনি, তা একদম পরিষ্কার হয়ে যায় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল হাতে আসার পর।

অন্যদিকে, নির্বাচনি প্রচারণার সময় পেনসিলভানিয়া ম্যাকডোনাল্ডসের একটি ফ্রাই স্টেশনে কুকের কাজ করে ট্রাম্প প্রতীকীভাবে গণসংহতির বার্তা দিয়েছিলেন। তবে সেসব ভোটার এখন কী দেখছে? তাদের প্রেসিডেন্ট এমন এক নীতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, যার ফলে ফাস্টফুড থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস, গাড়ি, নতুন বাড়ি ইত্যাদি সবকিছুই কিনতে বেগ পেতে হবে। ট্রাম্প হয়তো চাইছেন, বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো গেলে, দেশীয় অর্থনীতি এগিয়ে যাবে, দেশে পণ্যের দাম আরো সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। তবে এমন সহজ চিন্তা আধুনিক অর্থনীতি বা বিশ্ববাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখার প্রশ্নে কতটা সংগতিপূর্ণ, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিশ্লেষকদের দাবি, শুল্ক আরোপের ফলে ট্রাম্পের ধনী বন্ধুদের বিশেষ সুবিধা হবে বটে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলো। ট্রাম্প অবশ্য স্বভাবসুলভ সদম্ভে গণমাধ্যমের সামনে হুংকার ছেড়েছেন যে, গাড়ি কেনার খরচ বেড়ে গেলেও 'তার কিছু যায় আসে না'।

এই পরিস্থিতিতে বিদেশি দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটাই দেখার বিষয়। এরই মধ্যে অবশ্য চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নড়েচড়ে বসেছে, নিজ নিজ কর্মপন্থায় নিবিষ্ট হয়েছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের বক্তব্য, এর প্রতিবাদস্বরূপ পক্ষগুলো থেকে ‘পালটা জবাব’ আসবে নিশ্চতভাবে।

ট্রাম্প সাধারণত একবার শুল্ক আরোপ করলে, সেখান থেকে খুব একটা কাটছাঁট করেন না! ফলে এবার যে হারে শুল্ক ধার্য করা হয়েছে এবং তাতে যদি ধরে নেওয়া হয় যে, এতে আর কোনো কাটছাঁটের সুযোগ থাকবে না, তাহলে গোটা বিশ্বই পড়ে যাবে ‘একটি পূর্ণাঙ্গ' বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে। সত্যি বলতে, বিদেশি অনেক নেতা ট্রাম্পের মতোই 'রাজনৈতিক কারণের শিকার'। ফলে তারা আমেরিকার রপ্তানি পণ্যের ওপর কমপক্ষে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার জন্য জনতার চাপের মুখে থাকবেন। আর সেক্ষেত্রে যদি তারা যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে জনরোষ অবধারিতভাবে আরো বাড়বে।

মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প যেসব দেশের ওপর শুল্ক বসিয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্তত ১০ শতাংশ হারে সর্বজনীন শুল্ক আরোপ করতে পারে। আর তিনি যে দেশগুলোকে ‘সবচেয়ে বাজে অপরাধী' হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তারা নিশ্চিতভাবে শুল্কহার অনেক বেশি বাড়াতে চাইবে। 

বিশ্বস্ত মার্কিন মিত্র অস্ট্রেলিয়া অবশ্য নড়েচড়ে বসেছে তৎক্ষণাৎ। যদিও দেশটির ওপর আরোপিত শুল্কহার মাত্র ১০ শতাংশ। কিন্তু এর পরও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘এটা কোনো বন্ধুর কাজ হতে পারে না'। কোনো সন্দেহ নেই, আলবানিজের সুরেই কথা বলবেন বাকি বিশ্বনেতারা। ফলে এই 'বিদেশি প্রতিশোধ' থেকে জন্ম নিতে পারে ‘একটি উত্তেজনাকর সিঁড়ি', চলমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় যা আদৌ কাম্য নয়।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র কেন কম্বোডিয়ার মতো ক্ষুদ্র, সমস্যাগ্রস্ত দেশের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর পাঁয়তারা করছে, তা সত্যিই অস্পষ্ট। বেশ কিছু দেশের ওপর ৩০ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কেন চাপিয়ে দেওয়া হলো, সে সম্পর্কেও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হাজির করতে পারেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একইভাবে, আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশের মানুষগুলোর জীবনকে কেন তিনি আরো কঠিন করে তুলতে চাইছেন, এটা কোন যুক্তিতে ‘একটি ভালো চিন্তা'—সেসব প্রশ্নের উত্তরও খোলাসা করেননি। এমনকি তিনি কেন পেঙ্গুইনদের (অ্যান্টার্কটিকা) সঙ্গে অর্থনৈতিক লড়াইয়ে নামছেন, তাও অজানা?

হোয়াইট হাউজের শুল্ক তালিকায় অ্যান্টার্কটিকার ক্ষুদ্র হার্ড এবং ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জ অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি হতবাক করেছে সবাইকে। সামুদ্রিক পাখিদের জন্য 'স্বর্গরাজ্য' খ্যাত এই অঞ্চলের ওপর শুল্ক চাপিয়ে ওয়াশিংটনের কী এমন বিশেষ লাভ হবে, তার ব্যাখ্যা যেন নেই কারো কাছেই!

নতুন শুল্ক আরোপের আরেকটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দশক ধরে যে 'মুক্ত বাণিজ্য বিশ্বব্যবস্থা' তৈরিতে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে আসছে, তাও থমকে যাবে এর ফলে; অর্থাৎ, ট্রাম্প যে নতুন বাজিটি ধরে বসেছেন, তা থেকে তিনি স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রাজনৈতিক সুবিধাই হাসিল করতে পারবেন না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেক বিশ্লেষক এমনো বিশ্বাস করেন যে, এটা ট্রাম্পের এমন এক কল্পনা বা পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের নতুন কারখানা স্থাপনে একধরনের চাপ দিচ্ছেন এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরো নির্বিঘ্ন করতে চাইছেন। কোনো কোনো দেশ হয়তো তা করবেও বটে, কিন্তু ট্রাম্পের পর যিনি বা যারা ক্ষমতায় আসবেন, তখন এই প্রকল্পগুলোর অবস্থা কী হবে? সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার সুপ্ত বাসনার কথা জানা গেছে তার কাছ থেকে। এ নিয়ে তিনি বেশ গরম গরম কথাও বলছেন! যদিও ট্রাম্পের জন্য সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি আমেরিকার জন্য ‘এক ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে থাকলেও অবাক হব না। মন্ত্রিসভার সদস্য এবং কংগ্রেস নেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছেন, এটি দেশের জন্য খুব বড় মুহূর্ত। আমি মনে করি, আপনারা আজকের দিনটি বিশেষভাবে মনে রাখবেন।

তবে ট্রাম্প হয়তো ধারণা করছেন, তিনি দেশের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করে দিয়ে বোঝাতে চাইছেন যে, এর ফলে ১৯৩০-এর দশকের মতো মহামন্দা দেখা দিতে পারে। ঐ সময় যে ধরনের ‘বাণিজ্য বাধা (ট্রেড ব্যারিয়ার)' তৈরি হয়েছিল, ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ, মহামন্দার প্রত্যাবর্তন অনিবার্য!

শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, আজ মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। দিনটিতে আমাদের 'অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছে। সত্যি বলতে, এ ধরনের অতিরঞ্জিত বক্তব্য বা কথা অন্তত এক বারের জন্য হলেও ট্রাম্পকে ভোগান্তিতে ফেলে দেবে। যদিও ট্রাম্পের এমন এক 'বিশ্বস্ত ভোট ব্যাংক' রয়েছে, যারা তাদের নেতার প্রতি যে কোনো ঘৃণা বা বিদ্বেষকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে জানে। তা না হলে 'বিশ্ব সর্বদা আমেরিকাকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে, নিচ্ছে’–এই একটিমাত্র যুক্তি দিয়ে ট্রাম্প দুই-দুই বার নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়ে গেছেন! সুতরাং, লক্ষ করার বিষয়, তিনি যে নতুন স্বর্ণযুগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা তার দল এবং সর্বোপরি মার্কিন ভোটাররা কীভাবে নেন। ট্রাম্প একা হাঁটছেন, নাকি তার সঙ্গে আমেরিকানরাও আছেন, দেখতে হবে সেটাই।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক। সিএনএন থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান

ইত্তেফাক/এনএন