রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানা। বিমানবন্দর সড়কের পাশে এই থানার অবস্থান। জুলাই-আগষ্ট আন্দোলনে রাজধানীর যে কয়েকটি থানা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, উত্তরা পূর্ব থানা অন্যতম। চার তলা বিশিষ্ট থানা ভবন পুরাটাই জ্বালিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে পুলিশের ‘ফাংশন’ কাজ করতে থানা ভবনের অবকাঠামো মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়। সাত মাস ধরে থানার মেরামত কাজ চালানো হয়। তবে মেরামত করা ভবনের জানালা-দরজা এরই মধ্যে আবারও খুলে পড়ছে। বিভিন্ন দেয়ালের পোড়া অংশ মুছতে যে রঙ করা হয়েছে, সেখান থেকে এখনও পোড়া পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে।
ভবনের তিন ও চার তলায় ব্যারাক। ব্যারাকের প্রতিটি কক্ষে এখনও সিলিং ফ্যান লাগানো হয়নি। নিচ তলায় ওয়েটিং রুমে নেই ফ্যান। জানা গেল, থানায় ২০ টি সিলিং ফ্যান প্রয়োজন। মাত্র ১০ টি সিলিং ফ্যান লাগানো হয়েছে। হাজতখানায় স্ট্যান্ড ফ্যান থাকার কথা থাকলেও সেটি গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেয়া হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা পূর্ব থানার ওসি শামীম হোসেন বলেন, অবকাঠামো মেরামত করা হলেও সেসব আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সিলিং ফ্যানের সংকট রয়েছে। আপাতত ৫ টি গাড়ি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ টি নতুন। বাকি ৪ টি পুরাতন। পুরাতন ৪ টি গাড়ির মধ্যে প্রায়ই ১ টি গাড়ি নষ্ট থাকে। আপাতত এসব দিয়েই থানার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি সাধারণ মানুষকে পুলিশ সেবা দিতে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ ও আলোচিত থানা যাত্রাবাড়ীতে সরজমিনে দেখা যায়, পাঁচ তলা থানা ভবন পুরোটাই সাদা রঙ করা হয়েছে। আন্দোলনের পর এই থানা ভবন একেবারে পুড়ে যায়। জানালা-দরজা লাগানো হয়েছে। দোতালায় ডিউটি অফিসার ও ওসি কক্ষে চেয়ার-টেবিল দেয়া হয়েছে। দেয়া হয়েছে একটি ফটোকপি মেশিন। তবে কক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত আসবাবপত্রের অভাব রয়েছে। তবে নতুন ভবনের পেছনে যাত্রাবাড়ী থানার পুরাতন দোতালা ভবন এখনও বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এটি মেরামতের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কামরুজ্জামান বলেন, দুই মাস হল যাত্রাবাড়ী থানায় তিনি এসেছেন। এর আগেই থানার অবকাঠামো মেরামত করা হয়। একটা থানা চালাতে মোটামুটি যা দরকার হয়, তার সবই দেয়া হয়েছে। তবে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সংকট রয়েছে।
সাত মসজিদ রোডে চার তলা বিশিষ্ট মোহাম্মদপুর থানা জ্বালিয়ে দেয়ার পর প্রায় একমাস থানা ভবনে পুলিশ কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। ভবনের পোড়া দেয়াল রঙ করা হয়। সরবরাহ করা হয় টেবিল, চেয়ার, ফাইল কেবিনেট, দর্শনার্থীদের বসার চেয়ার, কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন। ভবনে রঙ করার পরও এখনও পোড়া গন্ধ নাকে আসে।
এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান বলেন, থানায় অফিসারসহ টহল ডিউটির জন্য ৭ টি গাড়ি দেয়া হয়েছে। মোটরসাইকেল দেয়া হয়েছে ১৩ টি। এছাড়া এলাকার দানশীল বিত্তবানরা থানার অবকাঠামো উন্নয়নে এগিয়ে আসেন। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু আসবাবপত্র পাওয়া গেছে। গাড়ি ও আসবাবপত্রের সংকট নেই। যা আছে তাই দিয়ে আমরা পুলিশ সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্থ থানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে পল্টন থানার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গত বছরের নভেম্বর মাসে এই থানার কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়। থানার ওসির কক্ষ, ব্যারাক, ডিউটি অফিসারের কক্ষসহ সব কক্ষের দেয়ালের বড় অংশ জুড়ে নতুন করে প্লাস্টার করে রঙ দেয়া হয়েছে। ভবনের সমুদয় আসবাবপত্র পুড়ে যায়। সেসব মেরামতের কাজ তিন মাস ধরে চলে। এরপর থানার কার্যক্রম শুরু হয়।
এ ব্যাপারে পল্টন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুজ্জামান বলেন, ‘থানায় দেয়া ৮ টি গাড়ির মধ্যে ২ টি নতুন। মোটরসাইকেল দেয়া হয়েছে ৭ টি। আপাতত এই দিয়েই আমরা ডিউটি করছি।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-আগষ্ট আন্দোলনে রাজধানীর ৫০ থানার ১০৪ টি গাড়ি আগুনে জ্বলে সম্পূর্ণরুপে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেছে। ১৯৭ টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে যেগুলো পরবর্তীতে মেরামত করে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর ১২৪ টি গাড়ি ভাংচুর করার ফলে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এ ঘটনায় পুলিশের আনুমানিক ৬৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। থানা ভবনগুলোর মধ্যে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা পূর্ব, মোহাম্মদপুর, পল্টন, কদমতলী, বাড্ডা, বংশাল, ওয়ারী, শেরেবাংলা নগর, মিরপুর ও পল্লবী থানা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। থানার বেশিরভাগ কাগজপত্র, অপরাধীর তথ্য, মামলার ডকেট ও অন্যান্য নথি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
বেশিরভাগ থানায় কনস্টেবলদের থাকার জন্য ব্যারাক রয়েছে। ব্যারাকে কনস্টেবলদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও বিছানা পুড়ে গেছে। এর পাশাপাশি কনস্টেবলদের ব্যক্তিগত ট্রাংক লুট হয়ে যায়। ওইসব ট্রাংকে কনস্টেবলদের মাসের বেতনের টাকা ও জমানো টাকা ছিল। এছাড়া কনস্টেবল, এএসআই ও এসআইদের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল পুড়ে গেছে। অনেকের মোটরসাইকেল লুট হয়ে গেছে। পুলিশের এসব ব্যক্তিগত ক্ষতির হিসাব এখনও নিরুপন করা হয়নি।
জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া শাখার উপকমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো পুলিশ সদস্য তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ পুড়ে যাওয়া বা লুট হওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেনি। যদি কেউ অভিযোগ করেন, তখন আমরা বিষয়টি বিবেচনায় নিব।
থানার গাড়ি ও আসবাবপত্র সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের নিজস্ব তহবিল থেকে ৫০টি নতুন গাড়ি কিনেছি। প্রত্যেক থানায় একটি করে নতুন গাড়ি দেওয়া হয়েছে। আবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও আমরা গাড়ি পেয়েছি। সব মিলিয়ে আমরা এই সম্পদ দিয়েই নগরবাসীর সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।
