পঞ্চাশের দশকে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই সিনেমা শিল্পে জোয়ার সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পর সেই জোয়ারে ভর করে দেশে তুমুল জনপ্রিয়, ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলায় একের পর এক নির্মিত হতে থাকে প্রেক্ষাগৃহ। নব্বইয়ের দশকে এসে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় দেড় হাজারে।
তবে শূন্য দশকে এসে সৃজনশীল আর পারিবারিক ঘটনাপ্রবাহের জনপ্রিয় সিনেমার বাঁক বদলে যায়। অশ্লীলতা জেঁকে বসলে ঢাকাই সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন দর্শকরা। ফলে ধীরে ধীরে প্রেক্ষাগৃহবিমুখ হতে থাকেন তারা। প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা ধারাবাহিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এতে অনেকে লোকসানের মুখে সিনেমা হল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। গত দেড় দুই দশকে দেশে একে একে প্রায় সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়েও কোনোরকমে টিকে আছে ৫০-৬০টির মতো।
এমন পরিস্থিতিতে ঢাকাই সিনেমার সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয় সরকার। ভালো মানের সিনেমা নির্মাণে পরিচালক ও প্রযোজকদের অনুদান দেওয়া শুরু করে। সেই সঙ্গে নতুন করে প্রযুক্তিসম্পন্ন হল ও সিনেপ্লেক্স নির্মাণ ও পুরোনো হল সংস্কারে উত্সাহ দেওয়া শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে হল মালিক ও উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ব্যাংকঋণ দেওয়া শুরু করে।
তবে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পী ও কলাকুশলীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে চলচ্চিত্রশিল্পে নবজাগরণ আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই উদ্যোগ হল মালিকদের অনীহার কারণে থমকে গেছে। হল মালিকদের আশঙ্কা, দেশে ভালো মানের কোনো সিনেমা নেই, দর্শকরাও হলবিমুখ—এমন পরিস্থিতিতে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। ফলে দেশে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ থমকে আছে।
বিষয়টি নিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশের প্রায় ২৯টি জেলা এখন সিনেমা হলশূন্য। ইতিমধ্যেই দেশের প্রধান যে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ঢাকার গুলিস্তান, বিউটি, রূপমহল, নাজ, শাবিস্তান, মল্লিকা, পূরবী, স্টার, সুরমা, লায়ন, যমুনা, অভিসার, আগমন, ডায়না, জোনাকি, চিত্রামহল, অতিথি, মানসী, পূর্ণিমা, রাজমণি, পদ্মা, মুনসহ আরো অনেক।
বর্তমানে কিছু কিছু দর্শকপ্রিয় সিনেমা নির্মাণ হলেও তাতে ভালো মুনাফার মুখ দেখেন না প্রযোজক ও হল মালিকরা।
জানতে চাইলে মধুমিতা সিনেমা হলের নির্বাহী পরিচালক, প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ও প্রযোজক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ ইত্তেফাককে বলেন, চার মাস পর সিনেমা হল খুললাম। এছাড়া সারা বছরই বন্ধ থাকে। এই শিল্পকে বাঁচাতে আমরা টিকে থাকার লড়াই করছি। অথচ এই শিল্পকে কেউ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। এজন্য আমরা সরকারকে পাশে চাই।
ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, দু-একটা ছবি যে বছরে ব্যবসাসফল হচ্ছে না, তা বলছি না। কিন্তু, এতে করে কি সিনেমা হল টিকে থাকবে? বাংলাদেশের সিনেমা এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। আর যদি দিনকে দিন হলের সংখ্যাও কমতে থাকে, তাহলে বিশাল সংকটে পড়তে হবে। একসময় দেশে হলই থাকবে না। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রশ্নে সব বিভেদের দেওয়াল তুলে দেওয়া উচিত। কিছুদিন আগে নুসরাত ফতে আলী গান গেয়ে গেলেন। তারা কীভাবে অনুমতি পায়? আমি বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছি। তেমনি সিনেমা হল বাঁচিয়ে রাখতে হলে ভারত পাকিস্তানের প্রডাক্ট বা সিনেমা দরকার।
৯৬ বছর ধরে সিনেমা শিল্প নিয়ে গর্বের সঙ্গে টিকে আছে দেশের প্রাচীনতম সিনেমা হল লায়ন। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মীর্জা আব্দুল খালেক ইত্তেফাককে বলেন, ঈদ ছাড়া কোনো ব্যবসাই নেই। মূলত টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় সিনেমা হল বন্ধ করে দিই। কিন্তু ভেতরে কোথায় যেন আশার আলো জ্বলছে। ভালো কিছুর জন্য এখনো আশায় বুক বেঁধে আছি। গত কোরবানির ঈদে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকে এই ঈদের আগের দিন পর্যন্ত খুবই খারাপ অবস্থায় আছি। গত সাত মাসে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ঈদে সেই ক্ষতি পুষিয়ে তোলার চেষ্টা করছি। তিনি জানান, রাজনৈতিক সরকার যখন ছিল তাদের কাছে আলোচনার জন্য যাওয়া যেত। তারা কথা শুনতেন। অনেক সময় কাজ হতো, কখনো কখনো হতো না। এই সরকার আসার পরে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম সাহেবের কাছে চিঠি দিয়ে বলেছিলাম, আমাদের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। কিন্তু দেখা হলো না। নতুন উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করা চেষ্টায় আছি। আমরা সমন্বিতভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা করব।
পরিচালক সমিতির সাবেক সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, সিনেমা চালিয়ে এখন হল মালিকরা লাভবান হতে পারছেন না। তাই হল ভেঙে মার্কেট বানাচ্ছেন বা অন্য ব্যবসা করছেন। হল না থাকলে সিনেমা কীভাবে দেখবে মানুষ? তাই যে কোনোভাবেই হোক সিনেমা হল টিকিয়ে রাখতে হবে। আমরা সরকারকে পাশে চাই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিনেমা হল টিকিয়ে রাখতে দরকার কনটেন্ট। কিন্তু সেটা নেই। যেসব সিনেমা নির্মিত হচ্ছে তাও মানসম্মত নয়। বর্তমানে যেকটি সিনেমা হল চালু আছে, তাতে ১ কোটি টাকা খরচ করে সিনেমা বানালেও লগ্নিকৃত অর্থ তুলে আনা সম্ভব নয়। ফলে স্বল্প বাজেটে কোনোরকমভাবে সিনেমা নির্মাণ করতে গিয়ে তা মানসম্মত হচ্ছে না। ফলে দর্শক হারাচ্ছে। আর তাতে সিনেমা বন্ধের ধারাবাহিকতা চলছেই।
প্রসঙ্গত ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে আছে পুরান ঢাকার গুলিস্তান, নাজ; সদরঘাটের রূপমহল, মুন, স্টার; আরমানিটোলার শাবিস্তান; এলিফ্যান্ট রোডের মল্লিকা; বাসাবোর অতিথি, আগমন; ইসলামপুরের লায়ন; চকবাজারের তাজমহল; পোস্তগোলার মেঘনা, যমুনা, ডায়না; শ্রীনগরের ঝুমুর; নারায়ণগঞ্জের মিনতি; কারওয়ান বাজারের পূর্ণিমা। সবশেষে বংশালের মানসী হলটির মূল মিলনায়তন ভেঙে সেখানে মার্কেট করা হয়েছে। এটি ঢাকার প্রথম ১০ হলের একটি।
রাজধানীর পরেই চলচ্চিত্রের বড় বাজার ছিল চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, যশোর। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির দেওয়া তথ্যমতে, গত দুই দশকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে ২০টি প্রেক্ষাগৃহ। হারিয়ে গেছে অলংকার, লায়ন্স, সানাই, রঙ্গম, সাগরিকা, বনানী, নূপুর, জলসা, গুলজার, উপহার, রিদম, উজালা, আকাশ, মেলোডি, সিনেমা কর্ণফুলী।
বিভাগীয় শহর রাজশাহী ও কুমিল্লায় কোনো সিনেমা হল নেই। একসময় যশোরের পরিচিতি ছিল সিনেমা হলের শহর হিসেবে। ২১টি সিনেমা হল থেকে কমতে কমতে এখন মাত্র ২টি সিনেমা হল চালু আছে। খুলনায় সিনেমা হল ছিল ১১টি। এখন আছে তিনটি। সিলেটের সাতটির মধ্যে একটি এবং রংপুরের পাঁচটি হলের মধ্যে একটি টিকে আছে।
পর্যটননগরী কক্সবাজারে আগে দুটি হল ছিল। রাঙামাটি শহরেও নেই সিনেমা হল। আগে এখানে তিনটি হল ছিল। নরসিংদী জেলা শহরের তিনটি সিনেমা হলের একটিও এখন চালু নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তিনটি হলের সব কটিই এখন বন্ধ। সিনেমা হল নেই ঝালকাঠি, নড়াইল, পঞ্চগড়, মুন্সীগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলা শহরেও। এছাড়া পটুয়াখালী, দিনাজপুর, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুরে বর্তমানে মাত্র একটি করে হল চালু আছে।
