যুদ্ধের অভিঘাত কতটা মারাত্মক হইতে পারে; সংঘাত-সংঘর্ষ পৃথিবীর মানচিত্রকে কীভাবে বদলাইয়া দিতে পারে এবং সর্বোপরি 'সৃষ্টির সেরা জীব' মানুষের জীবনের মূল্যকে কোন পর্যায়ে নামাইয়া আনিতে পারে, তাহা আমরা প্রত্যক্ষ করিতেছি ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায়। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়া এই ভূখণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে, আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় 'প্রতি বর্গমাইল ভূমি রক্ষার জন্য' ঠিক কতসংখ্যক জীবন বলিদান করিবার প্রয়োজন পড়ে!
জাতিসংঘ গতকাল জানাইয়াছে, ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় গাজায় প্রতিদিন ১০০ শিশু হতাহতের শিকার হইতেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০ হাজার ৬০৯ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১ লক্ষ ১৫ হাজার ৬৩ জন আহত হইয়াছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো অধিক হইবে, সন্দেহ নাই। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নিহত বা আহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজার হাজার নারী-শিশু নিখোঁজ রহিয়াছে বলিয়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলির খবরে জানা যাইতেছে।
গাজার শিশুদের সঙ্গে যাহা ঘটিতেছে, তাহা যেন সৃষ্টিকর্তার সঙ্গেই প্রবঞ্চনা করার শামিল। নিষ্পাপ, কোমলমতি শিশুদের ব্যাপারে নমনীয় ও যত্নশীল হওয়া এবং তাহাদের সহিত মানবিক আচরণ করিবার ব্যাপারে বিশ্বের ধর্মগ্রন্থগুলিতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু কে শোনে কাহার কথা! সমগ্র বিশ্বে শিশুদের সম্বোধন করা হয়, অ্যাঞ্জেল বলিয়া, অর্থাৎ, তাহারা ফেরেশতাতুল্য; কিন্তু সেই খোদা-প্রেরিত ফেরেশতার সহিত আমরা কী ধরনের আচরণ করিতেছি? আমরা কি স্মরণে রাখতেছি যে, 'আল্লাহর খলিফা' নামে অভিহিত শিশুদের সহিত যেই অমানবিক আচরণ করা হইতেছে, তাহার সকলই তিনি দেখিতেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানবজাতির উদ্দেশে সতর্কতা উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেন, 'প্রতিটি শিশু এই বার্তা লইয়া জন্মগ্রহণ করে যে, স্রষ্টা এখনও মানুষের প্রতি আস্থা হারান নাই'; কিন্তু গাজার শিশুদের সহিত যেইরূপ আচরণ করা হইতেছে, সৃষ্টিকর্তা আমাদের উপর আর কতক্ষণ আস্থাশীল থাকিবেন, তাহাই প্রশ্ন!
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, গাজার হাজার হাজার শিশু স্বজন, পরিবারহীন হইয়া পড়িয়াছে। আহত শিশুরা যে মুক্তি পাইয়া গিয়াছে, সেই আশাও নাই। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বুলেট-বোমা, মিসাইলের শব্দে তাহাদের মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে, তাহা পর্যবেক্ষণ করিয়া মনশ্চিকিৎসকরা সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন, ট্রমাটাইজডের শিকার এই সকল শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কোনোই সম্ভাবনা নাই! ইহা বিশ্বের জন্য সত্যিই বড় দুঃসংবাদ। 'সমাজ কীভাবে শিশুদের প্রতি আচরণ করে, তাহার মধ্য দিয়া সমাজের চেহারা ফুটিয়া উঠে'- নেলসন ম্যান্ডেলার এই কথার প্রেক্ষাপটে গাজার পরিস্থিতি লইয়া আমরা কী বলিব? গাজার শিশুদের আমরা কী জবাব দিব? অথচ সমাজকর্মী হেনরি ওয়ার্ড বিচারের মতো গুণিজনেরা বিশ্বকে এই বার্তা জানাইয়া গিয়াছেন যে, 'শিশুরা হইতেছে এমন কিছু হাত, যাহার দ্বারা আমরা স্বর্গ স্পর্শ করিতে পারি।' সুতরাং, এই 'স্বর্গের হাত'গুলিকে রক্ষা করা কি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব নহে?
যুদ্ধ কখনোই কল্যাণ বহিয়া আনে না, এই সত্য আমাদের মনে রাখিতে হইবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হাঙ্গেরিয়ান যোদ্ধা পল কার্ন মস্তিষ্কের সম্মুখভাগে গুলি খাইয়া দৈবক্রমে বাঁচিয়া গেলেও জীবনের বাকি ৪০ বছর এক পলকের জন্যও ঘুমাইতে পারেন নাই, যেইখানে টানা ১১ দিনের অধিক মানুষ না ঘুমাইয়া সাধারণত বাঁচিয়া থাকিতে পারে না। যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষেই মানুষের ঘুম কাড়িয়া লয়। অতএব, আমরা শান্তির ঘুম ঘুমাইতে চাহি কি না, তাহা আমাদের ভাবিয়া দেখিতে হইবে।
মার্কিন কবি কার্ল স্যান্ডবার্গ একদম স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, 'একটি শিশু হইল স্রষ্টা-প্রেরিত সেই বার্তা যে, বিশ্বকে এখনো আগাইয়া যাইতে হইবে।' আমাদের সত্যিই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিয়া দেখিতে হইবে যে, স্রষ্টা-প্রেরিত গাজার শিশুদের প্রতি এহেন অমানবিকতার পর বিশ্ব আর ঠিক কতটা পথ আগাইতে পারিবে? গাজার শিশুদের রক্ষায় বিশ্বনেতৃত্ব কেন নীরব? তাহাদের এই নীরবতা ভাঙিবার কি সময় আসে নাই?
