এলডিসি উত্তরণ: অর্জনের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রহিয়াছে

আপডেট : ১৬ মে ২০২৫, ১১:৩৭

বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা হইতে উত্তরণ ঘটাইবে। ইহা আনন্দের খবর বটে। তবে, এই উত্তরণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক বিরাট মাইলফলক হইলেও, ইহার সহিত কিছু উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জও দেখা দিবে, বিশেষত বাংলাদেশের ঔষধশিল্প খাতে।

বাংলাদেশ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাজারে ঔষধ উত্পাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করিয়াছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করিতেছে দেশীয় ঔষধ কোম্পানিসমূহ, পাশাপাশি ১৫০টিরও অধিক দেশে রপ্তানি করিয়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করিতেছে। এই সাফল্যের মূল কারণ হইল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ পেটেন্টযুক্ত ঔষধ উত্পাদনে বিশেষ ছাড় পাইয়া আসিতেছে; কিন্তু এলডিসি তালিকা হইতে উত্তরণের পর এই সুবিধা আর থাকিবে না। ফলস্বরূপ, ঔষধশিল্পে উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি পাইবে এবং বিদেশি কোম্পানির প্রতিযোগিতায় দেশীয় কোম্পানিগুলি টিকিয়া থাকিতে হিমশিম খাইবে।

পেটেন্ট সুবিধা হারাইলে, বাংলাদেশকে জীবনরক্ষাকারী বহু ঔষধ আমদানি করিতে হইবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলি দেশের বাজারে উচ্চমূল্যে এই ঔষধ বিক্রি করিতে পারে, যাহা সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে চলিয়া যাইতে পারে। ইহার সহিত রপ্তানি বাজারেও প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিতে বাধা সৃষ্টি হইবে, কারণ চীন ও ভারত নিজেদের কাঁচামাল উত্পাদন করিয়া সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করিয়া থাকে। বাংলাদেশের ঔষধশিল্প কাঁচামালের জন্য এই দুই দেশের উপর নির্ভরশীল; ইহা অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করিতে পারে।

এলডিসি তালিকা হইতে উত্তরণের ফলে শুধু ঔষধশিল্পই নহে, বাংলাদেশের আরো কিছু শিল্প খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইবে। বিশেষত তৈরি পোশাক, চামড়াশিল্প এবং কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সীমিত হইয়া যাইবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নত দেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাইলে, বাংলাদেশের এই খাতসমূহ আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করিতে বাধ্য হইবে। ইহার সহিত পরিবেশ ও মান নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত শর্ত পূরণ করিতে হইবে, যাহা উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি করিবে। ইহার ফলে রপ্তানি আয় কমিবার ঝুঁকি বাড়িবে এবং দেশীয় শিল্পকে টিকিয়া থাকিবার জন্য অধিকতর উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করিতে হইবে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। প্রথমত, সরকারকে আরঅ্যান্ডডি (R&D) খাতে বিনিয়োগ বাড়াইতে হইবে এবং ঔষধশিল্পে উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধি করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্পাদন প্রক্রিয়া উন্নত করিতে হইবে। তৃতীয়ত, পেটেন্টযুক্ত ঔষধ উত্পাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করিবার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করিতে হইবে। অপরদিকে, বাংলাদেশ ট্রিপস চুক্তির অধীনে একটি ট্রানজিশন পিরিয়ডের জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিকট সময় বৃদ্ধির আবেদন করিতে পারে। এই সময়ে দেশীয় কোম্পানিগুলি পেটেন্টযুক্ত ঔষধ উত্পাদন ও গবেষণার সুযোগ পাইবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করিতে সক্ষম হইবে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশ যদি সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহা হইলে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করা সম্ভব হইবে। এই সংকটকে মোকাবিলার মাধ্যমে বাংলাদেশের ঔষধশিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো শক্তিশালী অবস্থান গড়িয়া তুলিতে সক্ষম হইবে। এই সমস্যাগুলি মোকাবিলায় আমাদের হাতে সময় খুব বেশি নাই। সুতরাং যাহা করিতে হইবে, কার্যকরী ও টিকসই পরিকল্পনা, অতি সত্বর গ্রহণ করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/টিএইচ