বিমান দুর্ঘটনা ও প্রকৌশলগত ত্রুটিবিচ্যুতি 

আপডেট : ১৮ মে ২০২৫, ০৬:০০

মহাশূন্য হইতে চাকা খসিয়া পড়িলেও ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ড্যাশ ৮-৪০০ মডেলের উড়োজাহাজের সফল অবতরণ এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা বটে। গত শুক্রবার দুপুর ১টা ২০ মিনিটে কক্সবাজার হইতে ৭১ জন যাত্রী লইয়া ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়া বিজি ৪৩৬ ফ্লাইটটির পিছনের একটি চাকা উড্ডয়নের পরপরই খুলিয়া পড়ে।

তথাপি, ক্যাপ্টেন বিল্লাহ ও ফার্স্ট অফিসার জায়েদের অসাধারণ দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধির জোরে বেলা ২টা ২০ মিনিটে বিমানটি নিরাপদে ভূমিতে অবতীর্ণ হয়। ইহাতে সকল যাত্রীই অক্ষত রহিয়াছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সুদক্ষ চালকের মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। তবে, এই ঘটনা বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশলগত ত্রুটির এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করিয়াছে, যাহা বিমানের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতে পারে।

এই রূপ ঘটনা বাংলাদেশে নূতন নহে। গত এক দশকে বাংলাদেশের বিমান সংস্থাগুলির উড়োজাহাজে ছোট-বড় মিলাইয়া বেশ কয়েকটি যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা নথিবদ্ধ হইয়াছে, যাহা প্রায়শই যাত্রীনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলিয়াছে। যদিও উন্নত দেশগুলিতে বিমান নিরাপত্তা মান অনেক উচ্চ, তথাপি সেইখানেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনার নজির বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও উড়োজাহাজের চাকা খোলা বা ইঞ্জিন বিকল হওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়াছে, কিন্তু উন্নত কারিগরি ব্যবস্থা এবং পাইলটদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হইয়াছে। এই সকল ঘটনা বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি, পুরাতন যন্ত্রাংশের ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তির অভাবই প্রধানত এই ধরনের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত বৎসর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই বিশ্বে ছয়টি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে। ইহাতে প্রাণ হারায় ২৩৬ জন। বিশেষ করিয়া, ২৯ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার মুয়ান বিমানবন্দরে অবতরণের সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে জেজু এয়ারলাইনসের একটি বিমান। ইহাতে নিহত হয় ১৭৯ জন। বিমানটি অবতরণের সময় রানওয়ের গিয়ার (চাকা) সমস্যায় পড়ে। ধারণা করা হয়, পাখির আঘাতে ঘটিয়াছে এমন দুর্ঘটনা। ইহা ছাড়াও প্রযুক্তিগত ত্রুটি তথা ইঞ্জিন, কন্ট্রোল গিয়ার সিস্টেম বা ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার ইত্যাদিতে ত্রুটি দেখা দিলে বিমান দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। পাইলট বা ক্রু সদস্যদের ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল বোঝাবুঝি ও অপারেশনগত ত্রুটি অথবা তাহাদের অবহেলা বা ঘুমাইয়া পড়া ইত্যাদি কারণেও দুর্ঘটনার শিকার হইতে পারে বিমান। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ; যেমন-ঝড়, তুষারপাত বা ঘন কুয়াশার কারণেও অনেক সময় বিমান পরিচালনা করা কঠিন হইয়া পড়িতে পারে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের একটি বিমান নেপালের কাঠমান্ডুতে দুর্ঘটনাকবলিত হইলে নিহত হয় ৪৯ জন।

অবশ্য এত কিছুর পরও আকাশপথে যাতায়াতে আতঙ্কের তেমন কোনো কারণ নাই। কেননা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে বিমান দুর্ঘটনার হার খুবই কম। প্রতি। লাখ যাত্রীর মধ্যে মাত্র ০.০৫টি দুর্ঘটনা ঘটে। ব্ল‍্যাক বক্স যাহা ফ্ল্যাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর)-এর মাধ্যমে বিমান দুর্ঘটনার কারণ বহুলাংশে নির্ণয় করা যায়। তবে এই ধরনের দুর্ঘটনা হইতে রক্ষা পাইবার উপায় হইতেছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী। উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে ক্যারিয়ার ল্যান্ডিং সিস্টেম (Carrier Landing System) এবং অ্যান্টি-স্কিড ব্রেকিং সিস্টেম (Anti-skid Braking System) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারে। প্রথমটি পাইলটকে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বা সীমিত দৃশ্যমানতায়ও নির্ভুলভাবে অবতরণ করিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে দ্বিতীয়টি ভেজা বা পিচ্ছিল রানওয়েতে চাকার পিছলে যাওয়া রোধ করিয়া নিরাপদ অবতরণে সহায়তা করে। এই সকল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশের বিনিয়োগ করা অত্যাবশ্যক। ইহার পাশাপাশি, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল শাখার কর্মীদের নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাহাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন সকল উড়োজাহাজের নিয়মিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যান্ত্রিক পরীক্ষা এবং ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশের দ্রুত প্রতিস্থাপন।

ইত্তেফাক/এএম