আমরা যেমন কর্ম করিব, তেমনই ফল পাইব 

আপডেট : ১৯ মে ২০২৫, ০৬:০০

গরিব থাকাটা নিশ্চয়ই অভিশাপের। গরিব মানুষের মেরুদণ্ড সোজা রাখিবার মতো সংগতি থাকে না। সেই কারণে দরিদ্র মানুষের মর্যাদাবোধও কম থাকে। সুতরাং সম্পদের আকাঙ্ক্ষা দোষের নহে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন 'দারিদ্র্য'কে মহান করিয়া কবিতা লেখেন, যখন বলেন- 'হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান। তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান'- তখন আমরা ভাবি, গরিবিপনা লইয়া আমাদের মহান কবি কী দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিয়াছেন!

তিনি তো নিজেই অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত পরিবেশে বড় হইয়াছেন। ছোটবেলায় তাহাকে ডাকা হইত 'দুখুমিয়া' নামে। 'দারিদ্র্য' যেন সেই কারণে নজরুলের নিকট 'যিশুখ্রিষ্টের সম্মানের সমান। কেবল তাহাই নহে, দারিদ্র্য তাহাকে দিয়াছে 'অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস।' এই অবধি শুনিতে বেশ ভালোই লাগে; কিন্তু তাহার পর কী হইল? কী বলিলেন বিদ্রোহী কবি? তিনি ইহার পর কবিতার ছত্রে ছত্রে দেখাইয়াছেন, দারিদ্র্যের দংশনে কীভাবে জীবন ধ্বংস হয়, নষ্ট হয় স্বপ্ন। নজরুল দরিদ্রতার কষাঘাতের বর্ণনা দিতে গিয়া বলিয়াছেন-'টলটল ধরণীর মত করুণায়! তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায়/করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হয়ে উঠি/ ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি।'

যথার্থই দরিদ্র অবস্থায় সকল স্বপ্ন টুটে যায়। সুতরাং দরিদ্রতা অবশ্যই অভিশাপ। আমাদের অবশ্যই দারিদ্র্যমুক্ত হইবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করিতে হইবে; কিন্তু অর্থবিত্ত কিংবা সম্পদ অর্জনের জন্য কেহ যদি সকল প্রকার নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়া রাহুর মতো গোগ্রাসে অর্থ-সম্পদ ভক্ষণ করিতে চাহে, তখন তাহা অসুস্থতা। তাহা এক ধরনের মানসিক বৈকল্য। দুঃখের ব্যাপার হইল, তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলিতে বহু ক্ষেত্রেই এমন অসংখ্য মানসিক বৈকল্যের মানুষ দেখা যায়। এই সকল মানুষ এতটাই অর্থ-কাঙাল যে, অর্থ-সম্পদ অর্জনের জন্য হেন কোনো কাজ নাই, যাহা করিতে পারেন না। সুযোগ পাইলে তাহারা সর্বোচ্চ খারাপ ব্যবহার করে। কিংবা বলা যায়, অর্থ-সম্পদ অর্জনের জন্য ইহারা অর্পিত ক্ষমতার সকলটুকু ব্যবহার করে। ইহারা যেন কনফুসিয়াসের সেই কথাটি বিশ্বাস করে, যেইখানে বলা হইয়াছে- 'অন্যায় করাটা কিছুই নহে, যদি না তুমি তাহা সর্বক্ষণ মনে রাখো।'

তাহারা মনে করেন, অর্থবিত্তে টইটম্বুর থাকিলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন এবং ক্ষমতা প্রয়োগে কোনো অপূর্ণতা থাকে না। অনেকেই মনে করেন, যাহারা বেশি অভাব দেখিয়াছে, তাহাদেরই নাকি অর্থের ক্ষুধা বেশি। কথায় আছে- 'অগুরু চন্দন ফেলে চায় শেওড়া কাঠ, কোকিলের ধ্বনি ফেলে বানরের নাট।' অর্থাৎ, ভালো ছেড়ে মন্দের প্রতি মানুষের অযৌক্তিক আকর্ষণ থাকে; স্বভাবদোষে মানুষ মন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অর্থের অপরিসীম শক্তি দেখিয়া অধিকাংশ মানুষই অর্থশক্তিতে বলীয়ান হইতে মরিয়া থাকেন। তাহারা মনে করেন-অর্থের এমনই শক্তি যে, অর্থ নিজেই শয়তানকে কিনিতে পারে। অর্থ যাহার, শক্তি তাহার। অর্থই যেন সকল জায়গায় আধিপত্য বিস্তার করে: কিন্তু অর্থ, বিশেষ করিয়া 'কালো অর্থ' একসময় 'অনর্থের' কারণ হইয়া উঠে।

মনে রাখিতে হইবে- 'অর্থতুরাণাং ন গুরুঃ ন বন্ধু'- অর্থলোলুপ ব্যক্তির গুরু নাই, বন্ধুও নাই। অকালমেঘের মতো কালো অর্থ-সম্পদ হঠাৎ আসে, আবার হঠাৎই চলিয়া যায়। কালো অর্থ-সম্পদের মালিকেরা ভুলিয়া যান-'অঘটন ঘটায় বিধি'-বিধানকর্তা ভালোমন্দ সকল ঘটনার কারিগর। কারণ, শাস্ত্রেই বলা আছে, 'অত্যুচ্ছায়ঃ পতনায়ন্তে'-অধিক বাড়িলে পতন অনিবার্য। মনে রাখিতে হইবে, যখন কোনো পতন আসে তখন তাহা আকস্মিক ঘটনা নহে। অকারণে কিছুই হয় না। ব্যাখ্যায় অক্ষম হইলে লোকে দৈবের দোহাই দেয়। অজ্ঞানে আকস্মিক ও দৈবঘটনার যুক্তি খাড়া করে; কিন্তু তাহারা ভুলিয়া যান-সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি-সাফল্য ও পার্থিব সৌন্দর্য-সম্পদ আল্লাহ্-তায়ালার বিশেষ অনুকম্পা। কয়লা অর্থ ময়লার জন্ম দেয়। মান্দারগাছের বীজ বপন করিলে সেইখানে কি চন্দনগাছ গজাইয়া উঠিবে? আমরা যেমন কর্ম করিব, তেমনই ফল পাইব।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন