ব্রেক্সিট পরবর্তী সম্পর্কের পুনর্গঠন

ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা চুক্তি

আপডেট : ১৯ মে ২০২৫, ১৭:৪৯

ব্রেক্সিটের প্রায় এক দশক পর, ব্রিটেন অবশেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য বাধা কমানো, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভ্রমণ সহজীকরণের  জন্য নতুন চুক্তি করেছেন।

সোমবার (১৯ মে) লন্ডনে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক সম্মেলনে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লেইন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা'র সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার।

 লন্ডনের ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের সাথে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কাইর স্টারমার। ছবি: সংগৃহিত

চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা। এই চুক্তির আওতায় ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো, যেমন BAE Systems, Rolls Royce এবং Babcock, ইউরোপের ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্পে অংশ নিতে পারবে। তবে তাদের জন্য আলাদাভাবে আরও চুক্তি করতে হবে। বাণিজ্যে, বিশেষ করে খাদ্য-পণ্য রপ্তানিতে অতিরিক্ত নিয়মের কারণে ছোট উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন, সেগুলো স্থায়িভাবে সহজ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর বিনিময়ে ইইউ ও ব্রিটিশ মৎস্য-জাহাজ আগামী ১২ বছরের জন্য পরস্পরের জলসীমায় প্রবেশাধিকার পাবে। এছাড়া, ব্রিটিশ ভ্রমণকারীরা ইউরোপীয় বিমানবন্দরে দ্রুত ই-গেট ব্যবহারের সুবিধা পাবেন এবং তরুণদের জন্য একটি সীমিত যুব চলাচল প্রকল্প চালু হবে, যার বিস্তারিত ভবিষ্যতে ঠিক করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইরাসমাস চুক্তিতে  ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত

ইরাসমাস হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন একটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, যুব ও ক্রীড়া উন্নয়নমূলক কর্মসূচি, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীরা ইউরোপে শিক্ষার সুযোগ পায়। ব্রেক্সিটের ফলে শিক্ষার্থীদের ইউরোপে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ অনেক কমে গিয়েছিল। স্টারমারের সরকার এই সুযোগ আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের ইউ এর সঙ্গে চুক্তিটি রাজনৈতিকভাবে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা। ছবি: সংগৃহিত

তবে চুক্তিটি স্টারমারের জন্য রাজনৈতিকভাবে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এতে মাছ ধরার অধিকার, বাণিজ্য মানদণ্ডে ইইউর তত্ত্বাবধান গ্রহণ, এবং অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে – যা মূল ব্রেক্সিট প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ব্রেক্সিটের প্রবল সমর্থক এবং রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ এই চুক্তিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং ‘আত্মসমর্পণ সম্মেলন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কনজারভেটিভ পার্টিও, যারা মূল ব্রেক্সিট চুক্তি করেছিল, এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নতুন চুক্তি

বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর একতরফা বাণিজ্য নীতির পর বিশ্বজুড়ে দেশগুলো নতুন বাণিজ্য সহযোগিতার দিকে ঝুঁকেছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে সময়ের দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ব্রিটেন ইতোমধ্যে ভারতের সাথে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকেও কিছু শুল্ক ছাড় পেয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ইইউ-এর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক পুনর্গঠন যুক্তরাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ ইউরোপ এখনো তাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

ব্রিটিশ জনগণের মনোভাব ও ভবিষ্যতের পথ

২০১৬ সালের ঐতিহাসিক গণভোটে ব্রিটেন ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপগুলো দেখায়, বেশিরভাগ ব্রিটিশ এখন ব্রেক্সিট নিয়ে অনুতপ্ত, যদিও তারা আবার ইইউতে যোগ দিতে চান না। এই মিশ্র অনুভূতির মধ্যে স্টারমার একটি বাস্তববাদী ও মধ্যপন্থী কৌশল নিচ্ছেন – ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা, তবে পূর্ণ সদস্যপদের পথে না হাঁটা।

২০২০ সালের গণভোটে ইংল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়লেও এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এখন তারা অনুতপ্ত। ছবি: সংগৃহিত

স্টারমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (X)-এ এক বার্তায় বলেন,‘এখন সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার, পুরনো রাজনৈতিক লড়াইয়ে আটকে না থেকে সাধারণ জ্ঞান ও বাস্তব সমাধান খোঁজার – যা ব্রিটিশ জনগণের জীবনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

এই সম্পর্ক পুনর্গঠন ব্রিটেনকে ইউরোপ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন না রেখে, একটি সমন্বিত, কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিণত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা । যেখানে ব্রেক্সিটের কঠোর বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনের মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব। 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

ইত্তেফাক/টিএস