৪১ বছর বয়সী বাংলাদেশি মহিলা সেলিনা বেগম অভিযোগ করেছেন যে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে এবং তার তিন মেয়ের শরীরে গভীর রাতে খালি প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে বেঁধে ফেলে। ত্রিপুরার সাবরাং সীমান্তের কাছে ফেনী নদীতে তাদেরকে ফেলে দেয়। ফেনী নদী ত্রিপুরার সাবরাং জেলা ও বাংলাদেশের খাগড়াছড়ির রামগড় থানা মাঝামাঝি সীমান্ত নির্দেশনা দেয়। বিএসএফের পুশইন করার পর ফেনী নদীতে তারা সারারাত ভেসেছিলেন। পরদিন সকালে বাংলাদেশের সীমান্তের বাসিন্দারা তাদেরকে উদ্ধার করে। সেলিনা বেগম বলেন, ‘তারা আমাদের কোমরে প্লাস্টিকের খালি বোতল বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়। আমার সন্তানরা বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে। আমরা সারা রাত নদীতে ভেসে ছিলাম।’
বিজিবি সূত্র জানায়, গত ২২ মে ভোর ৬টার দিকে রামগড়ের সোনাইপুল এলাকার কাছে স্থানীয়রা সেলিনা, তার স্বামী উম্মেদ আলী (৪৭) এবং মেয়ে রুমি খাতুন (১৬), রুম্পা খাতুন (১৫) এবং সুমাইয়াকে (৬) ফেনী নদী থেকে উদ্ধার করে। পরে মহামুনি ক্যাম্প থেকে বিজিবির সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে হেফাজতে নেন। পরিবারটি জানিয়েছে যে, তারা ভারতের হরিয়ানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিল। হরিয়ানার স্থানীয় পুলিশ যখন তাদেরকে আটক করে তখন তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। তাদের জমানো টাকা (রুপি) কেড়ে নেওয়া হয়। অনেকটা অভুক্ত অবস্থায় তাদেরকে একটা ট্রেনে তোলা হয়। কয়েক দফা ট্রেন পরিবর্তন করার পর তাদেরকে আনা হয় ত্রিপুরা রাজ্যে। সেখান থেকে গাড়িতে করে সাবরাং জেলা শহরের সীমান্তবর্তী বিএসএফের একটি ক্যাম্পে আনা হয়। এরপর তাদের প্রত্যেকের শরীরে খালি প্লাস্টিকের বোতল বেঁধে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪৫ বছর বয়সী এক মহিলা জানান, তিনি গত দশ বছর ধরে ভারতে বসবাস করছেন। ১০ মে তাকে এবং তার স্বামীকে পুলিশ আটক করে ৪৬ জনসহ দিল্লির একটি পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়। তিন দিন ধরে তাদেরকে খাবার দেওয়া হয়নি। শুধু পানি দেওয়া হয়। এরপর তাদেরকে একটি বাসে তোলা হয়। তিন-চার দিন ধরে বাস চলার পর তাদেরকে বাংলাদেশের সীমান্তের পাশে বিএসএফের একটি ক্যাম্পে জড়ো করে। এরপর তাদেরকে ভোররাত ৩টার দিকে বাংলাদেশের দিকে পুশইন করা হয়।
এসব বিষয় নিয়ে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, পতাকা বৈঠক এবং কূটনৈতিক মাধ্যমে বারবার প্রতিবাদ জানানো সত্ত্বেও বিএসএফ এবং ভারতীয় অন্যান্য সংস্থাগুলোর পুশইনের ঘটনা অব্যাহত থাকা দুঃখজনক।
তিনি বলেন, বিজিবি উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় নজরদারি এবং টহল জোরদার করেছে। যাদের পুশইন করা হচ্ছে তাদের অনেকেই বাংলাদেশি নাগরিক যারা বছরের পর বছর ধরে ভারতে বসবাস করছিলেন। তাদের অনেকের সন্তান ভারতে জন্মগ্রহণ করেছে এবং তাদের কাছে ভারতীয় নথিপত্র ছিল। কিন্তু পুশইন করার আগে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক সমস্ত নথিপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাবাসন পদ্ধতি এবং দ্বিপাক্ষিক নিয়ম লঙ্ঘন করে। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে এই বিষয়গুলো সমাধানের জন্য বিজিবি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ উল্লেখ করে বিজিবি প্রধান বলেন, ইউএনএইচসিআর (ভারত)-নিবন্ধিত ৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গত ৭ মে জোরপূর্বক কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পুশইন করা হয়।
বিজিবি ডিজি মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, মানবিক মান বজায় রাখা এবং এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি প্রতিবেশী দেশের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সঙ্গে নিবন্ধিত পাঁচ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকেও ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। আটককৃতরা, সকলেই একই পরিবারের সদস্য, আসামের মাটিয়া শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছিলেন।
ভারতের পুশইন বিষয়ে সেনা সদর দপ্তরের এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশনসের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তে বিষয়গুলো মোকাবিলা করছে। তবে যদি কোনো কারণে প্রয়োজন হয় বা সরকার আদেশ দিলে এ বিষয়ে সেনাবাহিনীও কাজ করবে। তবে বিষয়টি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’
২৪ দিনে ১০৫৩ জন পুশইন :
বিজিবি সদর দপ্তরের এক বিবৃতি অনুসারে, ৭ মে থেকে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে মোট ১ হাজার ৫৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি দিয়ে ১১১ জন, কুড়িগ্রাম দিয়ে ৮৪ জন, সিলেট দিয়ে ১০৩ জন, মৌলভীবাজার দিয়ে ৩৩১ জন, হবিগঞ্জ দিয়ে ১৯ জন, সুনামগঞ্জ দিয়ে ১৬ জন, দিনাজপুর দিয়ে দুই জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে ১৭ জন, ঠাকুরগাঁও দিয়ে ১৯ জন, পঞ্চগড় দিয়ে ৩২ জন, লালমনিরহাট দিয়ে ৭৫ জন, চুয়াডাঙ্গা দিয়ে ১৯ জন, ঝিনাইদহে ৪২ জন, কুমিল্লা দিয়ে ১৩ জন, ফেনী দিয়ে ৩৯ জন, সাতক্ষীরা দিয়ে ২৩ জন এবং মেহেরপুর দিয়ে ৩০ জনকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের দুর্গম মান্দারবাড়ীয়া এলাকা দিয়ে ৭৮ জনকে পুশইন করা হয়। এই ৭৮ জনকে কোস্ট গার্ড উদ্ধার করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানায় হস্তান্তর করে। এদের মধ্যে তিন জন রোহিঙ্গা এবং বেশ কয়েক জন ভারতের গুজরাটের বাসিন্দা রয়েছেন।
গোমস্তাপুরে পুশইনকৃত ১৭ জনকে পরিবারের নিকট হস্তান্তর :
গোমস্তাপুর সংবাদদাতা জানান, বিভীষণ সীমান্ত দিয়ে পুশইনকৃত শিশুসহ ১৭ জন পরিবারের নিকট হস্তান্তর করেছে পুলিশ। এর আগে গত মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের বিভিষণ সীমান্তের ২১৯/৭১ পিলারের ১৬০ গজ বাংলাদেশের ভেতরে লালমাটিয়া এলাকা থেকে বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের আটক করেন। আটককৃতদের মধ্যে ৯ জন শিশু, চার জন নারী ও চার জন পুরুষ রয়েছে। তারা কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। তারা বিজিবিকে জানায়, গত ১৭ মে ভারতীয় পুলিশ তাদেরকে হরিয়ানা প্রদেশ থেকে আটক করে ট্রেনযোগে হাওড়া জেলায় নিয়ে আসে। গত ২৪ মে হাওড়া থেকে বাসে করে ৮৮ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ ইটাভাটা ক্যাম্পের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তী সময়ে তাদেরকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করে।
পুশইন করা ১৬ জনকে ছাতক থানায় হস্তান্তর:সুনামগঞ্জের ছাতক সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ মহিলা, শিশুসহ ১৬ নাগরিককে পুশইন করেছে। নোয়াকোট বিওপি ক্যাম্পের হাবিলদার আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে একটি টহল দল বুধবার ভোরে ইসলাম পুর ইউনিয়নের ছনবাড়ী এলাকা থেকে তাদের আটক করে। আটক ১৬ জনকে গতকাল বিকালে ছাতক থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
লালমনিরহাটের বিভিন্ন সীমান্তে উত্তেজনা: লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলার পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বুধবার ভোররাতে ৫৭ ভারতীয় নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। কিন্তু বিজিবি ও এলাকাবাসীর প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় তারা। এরপর এসব ভারতীয় নাগরিকরা ভোররাত থেকে শূন্যরেখায় অবস্থান নেন। এ ঘটনায় বুধবার দুপুরের পর বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিজিবির কড়া প্রতিবাদের মুখে ঐসব নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় বিএসএফ। তবে বিএসএফ তাদেরকে সীমান্তের শূন্যরেখায় ফেলে রেখে চলে যায়। বুধবার সন্ধ্যার পর সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দেয়। এ অবস্থায় পুশইন রোধে সীমান্তে সতর্ক অবস্থান নেয় বিজিবি। এ সময় বিজিবিকে সাহস দিতে লাঠিসোঁটা হাতে তাদের পাশে দাঁড়ান এলাকাবাসী। তারাও রাত জেগে বিজিবির সঙ্গে অবস্থান নেয়।
