নির্ঘুম রাত কাটছে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের

আপডেট : ৩০ মে ২০২৫, ২১:৩৫

মুষলধারে বৃষ্টির কারণে রাঙ্গামাটি জেলায় বসবাসরত পাহাড় বাসীর মাঝে আতংক দেখা দিয়েছে। পাহাড় ধ্বসের শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী শত শত মানুষ। 

বৃহস্পতিবার (২৯ মে) রাত থেকে জেলার বেশ কিছু স্থানে পাহাড় ধ্বসের খবর পাওয়া গেছে। রাঙ্গামাটি সদর এলাকার লোকনাথ মন্দিরের আশ্রয় কেন্দ্রে বেশ কিছু পরিবার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন থেকে  সতর্কতা জারী করা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে রাঙ্গামাটি পৌর এলাকা সহ জেলার  প্রত্যেকটি উপজেলায় আশ্রয় কেন্দ্র গুলো।

এদিকে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে চলাচলকারী সব ধরনের নৌযান চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে  রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন। শুক্রবার (৩০ মে) রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ এক জরুরী বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নির্দেশনার কথা জানান। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত জারি রয়েছে। যাত্রী-সাধারণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদ উত্তাল থাকায়  এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। রাঙ্গামাটি জেলা সদর থেকে জেলার ছয়টি উপজেলার মানুষ প্রধানত নৌপথে চলাচল করে থাকে।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ বলেন, এ মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনের সঠিক তালিকা বলা যাচ্ছে না। কারণ প্রত্যেকটি উপজেলায় এ তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাঙ্গামাটি জেলা কাপ্তাই হ্রদ ও পাহাড় বেষ্টিত হওয়ায় এই জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৫০ হাজারের বেশী মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে। তবে  রাঙ্গামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাইসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে অধিক ঝুঁকিতে অন্তত ২০ হাজারের মতো মানুষ পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। যাদের পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার।

এদিকে জেলা শহরে পাহাড় ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত স্থানের মধ্যে ভেদভেদী, শিমুলতলী, রূপনগর, যুব উন্নয়ন এলাকা অন্যতম। কাউখালী উপজেলার ঘাগড়ার কলাবাগান জুনুমাছড়া, আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন, বেতছড়ি ও কাশখালীর কিছু এলাকা। নানিয়ারচর উপজেলার বগাছড়ি, বুড়িঘাট, সাবেক্ষং, নানিয়ারচর সদর এলাকার কিছু অংশ ও কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার ঢাকাইয়া কলোনি, রাইখালী, ওয়াগ্গা ও চিৎমরমের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে শত শত পরিবার। জেলার অন্যান্য উপজেলায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও তা সামান্য।  তবে বিস্ময়কর হলো- ওইসব এলাকায় জনবসতি বেড়েই চলেছে। অথচ ২০১৭ সালের পাহাড় ধসের ক্ষতচিহ্ন এখনো দৃশ্যমান রয়ে গেছে। এরপরও পাহাড় ধসের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করছে মানুষ। মৃত্যু-ঝুঁকি জেনেও বেড়েছে পাহাড়ের ঢালে বসবাস। গড়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি।

এদিকে জেলায় বন্যা, ভূমি ও পাহাড় ধসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের লোকজনকে নিরাপদে সরে যেতে সতর্ক করছেন জেলা ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তারা এলাকায় গিয়ে সতর্কতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করেছেন। 
ভারী বর্ষণের ফলে রাঙ্গামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই, লংগদু ও নানিয়ারচর উপজেলার অনেক এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কাপ্তাইয়ের এক বসতবাড়িতে ভেঙে পড়েছে বড় গাছ। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছে ঘরে থাকা সদস্যরা। এছাড়াও রাঙ্গামাটি সদরের ভেদভেডি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে তবে এতে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বৃষ্টির ফলে রাঙ্গামাটি চট্টগ্রাম সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধ্বসের খবর পাওয়া গেছে। রাঙ্গামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা রাস্তায় পড়ে থাকা পাহাড়ের মাটি সরিয়ে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করেছে।

জেলা প্রশাসন ও রোভার স্কাউটের বেশ কয়েকটি টিম রাঙ্গামাটি বিভিন্ন পাহাড় ধ্বস এলাকায় লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে কাজ করছে। 

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মো. হাবিব উল্লাহ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙ্গামাটির ভেদভেদী, শিমুলতলী, লোকনাথ মন্দির এবং বিএডিসিসহ ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয়দের সাথে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসার অনুরোধ করেন। পরিদর্শনে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের  প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ বলেন, জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয় কেন্দ্র খুলে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।তিনি বলেন, দুর্যোগে কারও কোনো অবহেলা বা দায়িত্বহীনতায় কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা এবার দুর্যোগ মোকাবিলায় বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও (এনজিও) সম্পৃক্ত করেছি। দুর্যোগে তাদের নিজেদের উদ্যোগে ভুক্তভোগী ও অসহায় লোকজনকে সহায়তায় এগিয়ে আসতে বলে দেওয়া হয়েছে। রাঙ্গামাটি জেলা সদরে ২৫টি,কাউখালী উপজেলায় ১০টি ও কাপ্তাই উপজেলা ১৬টি  আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় ২০১৭ সালের ১৩ জুন ভয়াবহ পাহাড় ধসে ৫ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের  প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তী ২০১৮ সালের জুনে জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ফের পাহাড় ধসে ২ শিশুসহ ১১ জন এবং ২০১৯ সালের জুনে জেলার কাপ্তাইয়ে তিনজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

ইত্তেফাক/এএইচপি