‘আমার বাবা ইসমাইল হোসেন বাতেন ২০১৯ সালে শাহআলীর মাজার রোড এলাকা থেকে গুম হয়েছে। গুমের পর থেকে আমাদের পরিবারের মধ্যে হাহাকার নেমে আসে। বাসায় পুলিশ নিয়মিত আসতো। সমাজের লোক আমাদের অন্য চোখে দেখতো। জুলাই গণঅভ্যূত্থানে হাসিনার পতনের পর ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরের সামনে আমরা রোদ বৃষ্টি উপক্ষো করে বসেছিলাম। হয়তো বাবা ফিরে আসবে? কিন্তু, তিনি এখনও গুম রয়েছেন। আমি ও আমার পরিবার জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। যে উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে জুলাই এর গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সেই চেতনা থেকে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সরে গেছে। তারা এখন আমাদের কথা ভাবছে না। যারা আমাদের পরিবারের সদস্যকে গুম করেছে তাদের বিচার করার কথা ভুলে গেছে। কথা গুলো কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেছিলেন গুম হয়ে যাওয়া বাতেনের বড় মেয়ে আনিসা ইসলাম ইনসা।
শনিবার (৩১ মে) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম সপ্তাহ উপলক্ষে ‘গুমের সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে বিচার কর’ শীর্ষক এ আলোচনা সভায় ইনসা এই সব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে থাকা ৮ জন বক্তব্য রাখেন।
অধিকারের সভাপতি ড. তাসনীম সিদ্দিকী সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধীকারের গবেষক তাসনীম ফাহমিনা। এসময় অন্যানের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শরিফুল ইসলাম, আলোকচিত্রী ও দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম, আয়নাঘর থেকে ফেরত আরমাদ বিন কাসেম আরমান ও সংগঠক ফাইজুল হাকিম লালা প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে গুম থেকে ফিরে আসা আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনন করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের পুনর্বাসনের জন্য আলাদা কমিশন বা কমিটি গঠন করা হোক। তিনি আরও বলেন, যারা গুম করেছে তাদের সকলকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। নইলে বিচারের বাণী আজীবন কাঁদবে।
আলোকচিত্রী ও দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম বলেন, বিগত সরকারের আমলে গুম সংক্রান্ত একটি ছবি প্রকাশ করার কারণে তাকে এবং তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের হেনস্তা হতে হয়েছে। বিগত আমলে যারাই সরকারের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করেছে তাদের গুম করা হয়েছে।
আয়নাঘর থেকে ফেরত আসা সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান বলেন, গুমের সব আলামত নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আয়না ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কারা করছে এগুলো? বর্তমান সরকারকে এই ঘটনার তদন্ত করতে হবে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধিকারের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা তাসনীম ফাহমিনা। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বাধীন বাংলাদেশে গুমের ঘটনা ঘটে। সেইসময় সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলসহ অনেকেই গুম হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমাকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক গুম করার অভিযোগ আছে। এরপর দেশে বহুদিন গুমের ঘটনা শোনা যায়নি। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে গুমের ভয়াবহ এবং সুসংগঠিত ধারা লক্ষ্য করা গেছে।
তিনি আরও বলেন, এই সময়ে রাজনৈতিক কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক এবং ইসলামিক জঙ্গী ট্যাগ দিয়ে বহু মানুষকে গুম করা হয়। এ সময় বেশ কিছু ব্যক্তিকে ভারতে গুম করে রাখা হয়েছিল। হাসিনার আমলে র্যাব, পুলিশ, ডিবি পুলিশ, ডিজিএফআই ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা এসব অপারেশন পরিচালনা করা হত। এ সময় গুমের ভুক্তভোগীদের অনেককে নির্যাতন করা হয় এবং অনেককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। যে সব ভিকটিম গুমের পর ছাড়া পেয়েছিলেন তাদের ছাড়া পাবার শর্তে চরম ভয় দেখানো হয়েছিল, ফলে তারা মুখ খুলতেন না। অনেক গুমের শিকার ব্যক্তি আজ অবধি ফেরত আসেননি।
হাসিনার আমলে ৭৩০ জন গুম:
সংবাদ সম্মেলনে অধিকারের উপস্থাপন করা তথ্য অনুযায়ি, গুমের ভিকটিমদের গোপন আটক কেন্দ্রে মানবেতরভাবে রাখা হত। যেমন টাস্কফোর্স ইন্টেলিজেন্স সেন্টারে ২ ফুট বাই ৪ ফুট সেলে রাখা হতো। যারা ফেরত এসেছেন তাদের অনেককে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন এবং ভারতে পালিয়ে যাবার পরপরই ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন কেন্দ্রে আটকে থাকা তিনজন গুমের ভিকটিম মুক্তি পান। এদের মধ্যে গুম হবার পর দুইজন আট বছর পর এবং একজন পাঁচ বছর পর মুক্তি পান। আয়নাঘর বা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলসহ গোপন বন্দীশালার অনেক আলামত ৫ আগস্টের পর নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। গুমের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করার জন্যই তা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০০৯ সালের জানুযারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৭৩০ জন গুম হয়েছেন। এদের মধ্যে ৮৩ জনকে গুমের পর বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ১৬২ জন কে আজ পর্যন্ত ফেরত পাওয়া যায়নি।
তাসনীম ফাহমিনা আরও বলেন, অধিকার সব সময় ধারনা করেছে যে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে কারণ হাসিনার আমলে সৃষ্ট ভয়ের সংস্কৃতির কারণে অনেক ভিকটিম এবং পরিবার গুমের ঘটনা রিপোর্ট করেননি। পরবর্তীতে ৫ আগস্টের পর অনেক ভিকটিম, পরিবার অধিকার ও গুম সংক্রান্ত কমিশনের কাছে তাদের গুমের ব্যাপারে রিপোর্ট করেছেন।
অন্তর্বতীকালীন সরকারের কাছে একাধিক দাবি:
অধিকারের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা তাসনীম ফাহমিনা অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের কাছে অধিকারের পক্ষ থেকে একাধিক দাবি করেন। সেগুলো হলো, গুমের শিকার যে সব ব্যক্তিরা ফেরত আসেননি তাদের ফেরত পাবার চেষ্টা করা এবং তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জনগনকে জানানো। যে সময় গুমের শিকার ব্যক্তি এখনও ফিরে আসেন নাই, তাদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির অধিকার পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা। গুমের পর কিছু ব্যক্তিকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরে তাদের পাওয়া গেছে। তাই ভারতে আরো গুমের শিকার ব্যাক্তি আছেন কি-না সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপন করে ব্যবস্থা নেয়া। যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের পর ফেরত এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং কারাগার থেকে ভিকটিমদের মুক্তি দিতে হবে এবং গুমের সঙ্গে জড়িত সমস্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার করতে হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা যাতে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অধিকার পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা। যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের পর ফেরত এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ব্যবহার করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে মুক্তি দিতে হবে।
