২০০৩ সালে ইরাকের বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সরকারের সমর্থিত সামরিক অভিযানে বিমান থেকে ফেলা ক্লাস্টার বোমায় নিহত হয় ১৩ বছর বয়সী হুসসাম ও ১৪ বছর বয়সী মুহাম্মদ। ইরাক যুদ্ধে প্রায় দুই লাখ সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন নানা তদন্তের চেষ্টা হলেও সরকার তা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো। তবে ২০১৬ সালে প্রকাশিত চিলকট তদন্ত রিপোর্টে সরকারের ভেতরকার ভয়াবহ ভুলের প্রমাণ পাওয়া যায়। লেবার পার্টির নেতা হিসেবে জেরেমি করবিন সে সময় পার্লামেন্টে রিপোর্টের প্রতিক্রিয়া জানান এবং বাগদাদের চার্চ হাউসে যুদ্ধফেরত সেনা ও ইরাকে নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চান।
জেরেমি করবিন বলেন, গাজার পরিস্থিতি আজ নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গাজায় ২০ মাস ধরে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি আবারও ভুল করছে বলে তিনি মনে করেন। লেবার পার্টি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসরায়েল সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা পাচ্ছে। ব্রিটেনে সরকার বদলালেও ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের অব্যাহত থাকার অভিযোগ করেন তিনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকার অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন সাময়িকভাবে বন্ধ করার কথা বললেও, পরবর্তীতে লেবার পার্টির সরকার অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ইসরায়েলে যেসব অস্ত্র দিয়েছে, তা আগের কনজারভেটিভ সরকারের চেয়েও বেশি।
জেরেমি করবিন জানিয়েছেন, ব্রিটেন এখনও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ ইসরায়েলে পাঠাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকার বলছে অস্ত্র রপ্তানিতে কিছু নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে এই যন্ত্রাংশ পাঠানো হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই ‘ব্যতিক্রম’ কি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গণহত্যা ঠেকানোর দায়িত্ব থেকেও ছাড় দিচ্ছে? এছাড়া সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভূমিকা নিয়ে অনুসন্ধান দাবি করেছেন, বিশেষ করে অস্ত্র সরবরাহ এবং গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির ক্ষেত্রে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সাইপ্রাসের আরএএফ আকরোটিরি ঘাঁটি পরিদর্শনে গিয়ে সেনাদের উদ্দেশে বলেন, ‘পুরো বিশ্ব তোমাদের ওপর নির্ভর করছে এবং আমাদের দেশের মানুষও তোমাদের ওপর নির্ভর করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে অনেক কিছুই হয়, যা সব সময় প্রকাশ করা যায় না... আমরা সব সময় বলতে পারি না, এখানে কী হচ্ছে।’ এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন সরকারের লুকোনো কিছু তথ্য থাকতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে জবাব দেয়ার পরিবর্তে এড়িয়ে যাওয়া এবং নীরবতা চলছে। জেরেমি করবিন বলেছেন, গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, তাই জনগণ জানতে পাবে মানবতার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকা কতটুকু।
এই পরিস্থিতিতে জেরেমি করবিন একটি প্রাইভেট মেম্বার্স বিল পেশ করতে যাচ্ছেন, যাতে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক হামলায় যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ, সর্বজনীন ও স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি থাকবে। এই তদন্তের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হবে, ইসরায়েলের কাছে কী ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের হত্যা কীভাবে হয়েছে, সরকারের আইনি পরামর্শ কি ছিল, আরএএফ আকরোটিরি ঘাঁটি গাজায় অস্ত্র পাঠানোর জন্য ব্যবহার হয়েছে কিনা, এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভাগাভাগি কেমন হয়েছে।
জেরেমি করবিন যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য ও লেবার পার্টির সাবেক প্রধান।
তথ্য: গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
