সাত দিনে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত একনজরে

আপডেট : ২১ জুন ২০২৫, ০০:৪৪

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত গড়িয়েছে দ্বিতীয় সপ্তাহে। ১৩ জুন, শুক্রবার ভোরে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাসহ একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই আগ্রাসনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় টানা পাল্টাপাল্টি হামলার একটি নতুন অধ্যায়। এরপর প্রতিদিনই দুই পক্ষের মধ্যে গোলাবর্ষণ, পাল্টা জবাব ও যুদ্ধের হুমকি আদান-প্রদান চলেছে।

সাত দিনে কী ঘটেছে, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক—

১৩ জুন

ভোরে ইরানের আটটি শহরে শতাধিক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল, যার লক্ষ্য ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জ, তাবরিজের পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্র, ইস্পাহান, আরাক ও কেরমানশাহর সামরিক ঘাঁটি ও ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র মজুতকেন্দ্র। এই হামলায় ইরানের সেনাপ্রধান ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধানসহ অন্তত ২০ জন সামরিক কমান্ডার নিহত হন।

এএফপির বরাতে জানা যায়, হামলার জবাবে একই দিন সকালে ইসরায়েলে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ইরানের পাঠানো ১০০টি ড্রোনের সবকটিই ভূপাতিত করা হয়েছে।

১৪ জুন

ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। তেল আবিব, মধ্য ইসরায়েলসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড জানায়, তারা ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ও বিমানঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে এ হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের তিনটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে দুই পাইলটকে আটক করার দাবি করে ইরান। জবাবে ইসরায়েল ইরানের অন্তত তিনটি প্রদেশে হামলা চালায়।

১৫ জুন

দুই ধাপে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান, যার একটি হাইফা বন্দরে আঘাত হানে এবং এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন; একইসঙ্গে বাত ইয়াম শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বহু ভবন বিধ্বস্ত হয়। এর পাল্টা জবাবে ইসরায়েল তেহরানসহ ইরানের একাধিক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তেহরানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবন, ইস্পাহানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামরিক ঘাঁটি এবং মাশহাদ বিমানবন্দরে একটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব হামলায় আইআরজিসি’র গোয়েন্দা প্রধানসহ দুই জেনারেল নিহত হন। এ অবস্থায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকেও সরাসরি হত্যার হুমকি দেয় ইসরায়েল।

১৬ জুন

তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শহরের পশ্চিমে একটি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানে ইসরায়েল। দেশটি ঘোষণা দিয়ে তেহরানে ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনে বিমান হামলা চালায়। হামলায় বিধ্বস্ত হয় মধ্য ইরানের কেরমানশাহ শহরের ফারাবি হাসপাতাল।

জবাবে ইসরায়েলের হাইফা ও তেল আবিব শহর লক্ষ্য করে একাধিক পাল্টা হামলা চালায় ইরান। হাইফাভিত্তিক বাজান গ্রুপ জানায়, তাদের বিদ্যুৎ ও স্টিম উৎপাদনকেন্দ্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন।

১৭ জুন

ইরানের ইস্পাহান, তাবরিজ ও তেহরানে ইসরায়েল ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়ে ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি করে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ কমান্ডার আলী সাদমানিকে হত্যার কথা জানায়।

পাল্টা হামলায় ইরান তেল আবিব ও উত্তর ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা ও মোসাদের ঘাঁটিতে আঘাত হানার দাবি করে। এদিন সংঘাতের মধ্যেই জি-৭ সম্মেলন ছেড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখন ইরানের আকাশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছি’—এবং খামেনিকে হত্যার ইঙ্গিত দেন।

১৮ জুন

তেহরান, ইস্পাহান প্রদেশ ও কারাজ অঞ্চলে বিস্ফোরণ ও বিমান হামলা চালিয়ে অস্ত্রাগার ও দুটি সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কারখানাসহ ৪০টি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের দাবি করে ইসরায়েল। এদিন ১২তম বারের মতো ইসরায়েলে দূরপাল্লার সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান, যার লক্ষ্য ছিল গোলান মালভূমি ও দক্ষিণ ইসরায়েল; বিস্ফোরণের খবর আসে তেল আবিব ও এর পূর্বাঞ্চল থেকেও। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকলে ইরান সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার কথা জানালেও আন্তর্জাতিক সংস্থা নেটব্লকস জানায়, পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি হুঁশিয়ারি দেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়ালে পরিণতি হবে ভয়াবহ। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “আমি ইরানকে হামলা করতেও পারি, নাও করতে পারি।”

১৯ জুন

ইসরায়েল নাতাঞ্জ ও খোনদাব পারমাণবিক স্থাপনাসহ ইরানের বহু স্থানে হামলা চালায়। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা তেহরানে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সদর দপ্তর ধ্বংস করেছে। কারাজ শহর ও পায়াম বিমানবন্দরের কাছেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ইরানের আরাক শহরে ভারী পানির (ডিউটেরিয়াম অক্সাইড মিশ্রিত থাকে) পারমাণবিক চুল্লিতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

অন্যদিকে ইরানের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ ইসরায়েলের বিরসেবা শহরের সোরোকা হাসপাতালে আঘাত হানে। এ ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। কিন্তু ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনার দাবি, হাসপাতাল নয়, এ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর ও গ্যাভ-ইয়াম টেকনোলজি পার্কে অবস্থিত গোয়েন্দা ঘাঁটি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত হবে কি না।

ইসরায়েলের তথ্যমতে, ইরানি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের ৫ হাজার ১১০ জনকে বাস্তুচ্যুত ঘোষণা করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস বলেছে, ইসরায়েলের হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬৩৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩২০ জনের বেশি।

(সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি, এএফপি)

ইত্তেফাক/আরআর