আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ: শেষ না মাত্র শুরু?

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৫, ১২:১৫

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলমান উত্তপ্ত সংঘাতের পর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একে ‘ভঙ্গুর’ এবং ‘সাময়িক বিরতি’ বলেই দেখছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাতকে অভিহিত করেছেন “১২ দিনের যুদ্ধ” হিসেবে। তার দাবি, এই যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ হতে পারত এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারত। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিরতি কি সত্যিই শান্তির পথে পদক্ষেপ, নাকি বড় সংঘাতের সূচনা?

সংঘাতের সময়রেখা

শনিবার (২১ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ফোর্দো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানে বোমা হামলা চালায়। ট্রাম্পের ভাষায়, এসব স্থাপনা “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করে দেওয়া হয়েছে। জবাবে সোমবার (২৩ জুন) ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি আল উদেইদে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

প্রথম দিকে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলেও, দ্রুত পাল্টে যায় পরিস্থিতি। ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ঘোষণা করেন, ইসরায়েল ও ইরান একটি “সম্পূর্ণ এবং চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি”তে পৌঁছেছে। যদিও যুদ্ধবিরতির কিছুক্ষণের মধ্যেই ইসরায়েল ফের পাল্টা হামলা চালায়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্পও।

কে কী অর্জন করল?

ইসরায়েলের অর্জন:

ইসরায়েল প্রথমবারের মতো তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি আঘাত হেনেছে। তারা দাবি করছে, আত্মরক্ষার স্বার্থেই এ হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকেও তারা সামরিকভাবে সরাসরি সম্পৃক্ত করেছে, যা ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তারা বিশ্বের নেতাদের কাছে নিজেদের “সাহসিকতা” প্রমাণ করেছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া:

ইরান একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিয়েছে। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর তারা নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি রক্ষায় প্রতিশ্রুতিশীল থাকার বার্তা দিয়েছে। ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে এবং পারমাণবিক উৎপাদন বন্ধ হবে না।

তবে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনও পরিষ্কার নয়। স্যাটেলাইট চিত্রে কিছু ধ্বংসের প্রমাণ মিললেও, জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ বলছে, তারা এখনো ফোর্দোর ক্ষতির পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারেনি। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে—ইরানের কাছে থাকা ৪০০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থান অজানা।

ভবিষ্যতের পথ: শান্তি না সংঘাত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি পথ খোলা আছে। এক, নতুন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমে নজরদারি ফিরিয়ে আনা। দুই, সংঘাতের পথেই ধাবিত হওয়া, যার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই ইরানের সংসদের নিরাপত্তা কমিটির প্রস্তাবে পাওয়া যাচ্ছে—তারা জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার সঙ্গে সকল সহযোগিতা স্থগিতের প্রস্তাব পাস করেছে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। যদিও এই প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি, তবে পশ্চিমা চাপ ইরানকে আপস করতে উৎসাহিত করতে পারে।

ইরান ও ইসরায়েল যা স্বাক্ষর করেছে তা “যুদ্ধবিরতি”, কিন্তু সেটা কখনোই “চুক্তিভিত্তিক শান্তি” নয়। উভয় পক্ষ এখনও উত্তেজনায় প্রস্তুত অবস্থানে রয়েছে। ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গি অতীতে যেমন ছিল, এখনো তা একই রকম—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের কাছাকাছি আসতে দেওয়া যাবে না। আর ইরানও তাদের পরমাণু কর্মসূচিকে সার্বভৌম অধিকার হিসেবে দেখছে। ফলে, স্থায়ী শান্তি অর্জন এখনও দূরের পথ।

যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু উত্তেজনার আগুন এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। ফলে আরও একটি সংঘাত কেবল সময়ের অপেক্ষা হতে পারে।

ইত্তেফাক/টিএইচ