গণপিটুনিতে হত্যার মিছিল যেন থামছেই না। বিশ্লেষকরা বলছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণে এই প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। আইন হাতে তুলে নিয়ে কখনো কাউকে অপদস্থ করা হচ্ছে, কাউকে হত্যা করা হচ্ছে। এগুলো আইনের শাসনের পরিপন্থি। সরকারকে শুধু বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, এর জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বশেষ কুমিল্লার মুরাদনগরে মা ও দুই সন্তানকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর আগেও এই ধরনের ঘটনায় শাস্তির পরিমাণ খুবই কম। ফলে অপরাধীরা উত্সাহিত হচ্ছে।
গুম কমিশনের সদস্য মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে দেশে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। সরকার মুখে শক্ত কথা বললেও কার্যত এমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি যে কারণে মানুষ ভয় পাবে। ফলে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে দেখাতে হবে যে তারা এ ব্যাপারে মুখে নয়, কাজে শক্ত। সরকারকে শক্ত পদক্ষেপ নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই এটা কমে যেত বলে আমার মনে হয়।’
সর্বশেষ কুমিল্লার মুরাদনগরে গতকাল বৃহস্পতিবার একই পরিবারের তিন জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার বাঙ্গরা থানার আকবপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ী গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- রুবি বেগম (৫৮), তার ছেলে রাসেল (৩৫) ও মেয়ে জোনাকি আক্তার (২৭)। এই ঘটনায় আহত অপর মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে আমরা যেটা জানতে পেরেছি, দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারটি মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে তাদের একটা বিরোধ ছিল। এর প্রেক্ষিতেই এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।’ ওসি বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। এজন্য আমরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের জন অভিযান চালাচ্ছি।’
গত রবিবার গাজীপুরে চুরির অপবাদ দিয়ে কারখানায় এক শ্রমিককে রশি দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মারধরের ভিডিও সমপ্রতি ছড়িয়ে পড়ার পর কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা হলেও জড়িত কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। এই ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত শনিবার ভোরের দিকে গাজীপুর নগরের কোনাবাড়ীতে গ্রিনল্যান্ড লিমিটেড নামের কারখানায় ঐ ঘটনা ঘটে। নিহত শ্রমিক হূদয় (১৯) টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শুকতার বাইদ গ্রামের আবুল কালামের ছেলে। তিনি কারখানাটিতে মেকানিক্যাল মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন।
গত শনিবার বেশ কয়েকজন মিলে রাজধানীর দারুস সালাম এলাকায় দুই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে কিছু যুবক ধারালো অস্ত্রসহ ঐ এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিল। তারা পথচারীদের ছিনতাই করত, বাসার দরজায় নক করত, নারীদের উত্ত্যক্ত করত এবং পুরো এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করেছিল। ঐ দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিন জন ধারালো অস্ত্রধারী যুবক আবারও এলাকায় আসে। স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলে এলাকাবাসী জড়ো হয়ে তাদের ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে গণপিটুনি দিলে দুই যুবকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের নাম তোফাজ্জল হোসেন। চোর সন্দেহে একদল ছাত্র তাকে দফায় দফায় মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সকরা তার মৃত্যুর কথা জানান। হল কর্তৃপক্ষ তোফাজ্জলকে প্রক্টরিয়াল মোবাইল টিমের কাছে হস্তান্তর করার পর টিমের সদস্যরা তোফাজ্জলকে হাসপাতালের পরিবর্তে প্রথমে শাহবাগ থানায় নিয়ে যান। এরপর পুলিশের পরামর্শে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে তোফাজ্জলকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ছাত্রদের দাবি, হলে শিক্ষার্থীদের খেলা চলার সময় কয়েকজনের মোবাইল ফোন চুরি হয়। শিক্ষার্থীরা তোফাজ্জলকে চোর সন্দেহে আটক করে বেধড়ক মারধর করে।
খোঁজ নিয়ে একটি ঘটনার বিচার খবর পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালের ২০ জুলাই বাড্ডায় স্কুল প্রাঙ্গণে ‘ছেলেধরা’ গুজবে তাসলিমা বেগম ওরফে রেনু নামে এক নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঐ দিন সকালে উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাসলিমা তার চার বছরের মেয়েকে ভর্তি করানোর বিষয়ে খোঁজ নিতে যান। সেখানে উপস্থিত কয়েক জন নারী তাকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহ করে পিটিয়ে হত্যা করে। ২০২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল ১৩ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। গত বছরের ৯ অক্টোবর এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। এ ছাড়া চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন আট আসামি। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তির নাম হূদয় ইসলাম মোল্লা ওরফে ইব্রাহীম ওরফে নয়ন মোল্যা।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী গণপিটুনির মাধ্যমে মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী ১০ মাসে গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৩ জন। গত ১০ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে ‘সবচেয়ে ভীতিকর’। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১০ বছরে গণপিটুনির সহস্রাধিক ঘটনায় কমপক্ষে ৮১৬ জন নিহত হয়েছেন। তবে প্রকৃত গণপিটুনির ঘটনা ও নিহত ও আহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) দেওয়া জুন মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে দেশে গণপিটুনিতে হত্যার সংখ্যা বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাসে অন্তত ৪১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ৪৭ জন গুরুতর আহত হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহতের মধ্যে দুই জনকে ডাকাতির অভিযোগে, তিন জনকে সন্দেহজনক চুরির অভিযোগে, এক জনকে খুনের অভিযোগে, দুই জনকে চুরির অভিযোগে এবং আরো দুই জনকে শিশু নির্যাতন ও নারী ধর্ষণের অভিযোগে হত্যা করা হয়।
গত মে মাসে গণপিটুনির ৩৪টি ঘটনায় সাত জন নিহত হয়েছিল এবং এপ্রিল মাসে আট জন নিহত হন বলে এমএসএফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই তুলনা এ মাসে গণপিটুনিতে হত্যার সংখ্যা বেড়েছে।
