প্রযোজনা নিয়ে এহসানুল হক বাবুর নির্মাণযাত্রা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৫, ১৯:৪৭

চার বছর আগের এই জুলাই মাসেই বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেয় বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। একজন মধ্যবিত্ত নারীর প্রতিরোধের গল্প, যে গল্প প্রথমবারের মতো কানের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে পৌঁছে দেয় বাংলা সিনেমাকে। সিনেমাটির পেছনের সকলের সাথে যার নামটি বিশেষভাবে উল্লেখ হয়, তিনি সিনেমাটির প্রযোজক এহসানুল হক বাবু, যিনি ছবির স্বপ্নটিকে বাস্তব করে তুলেছিলেন পর্দার আড়ালে।

চলতি মাসে চার বছর পূর্ণ হলো দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের এই ঐতিহাসিক যাত্রার। সময়ের প্রেক্ষিতে বদলেছে চলচ্চিত্রের ভাষা, বদলেছে প্রযোজনার ধরনও। এহসানুল হক বাবুও পরিচিত হয়েছেন সময়ের থেকেও এক ধাপ এগিয়ে থাকা প্রযোজকের পরিচয়ে।

এহসানুল হক বাবুর জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, পড়ালেখা সবই ঢাকায়। স্নাতক করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে, তবে অঙ্কের খাতায় আটকে থাকেননি। সিনেমা, গল্প আর ভিজ্যুয়ালের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে নিয়ে আসে ভিজ্যুয়াল নির্মাণের দুনিয়ায়। বাবুর ভাষায়, ‘লাইফের টার্নিং পয়েন্ট’।

এহসানুল হক বাবু। ছবি: সংগৃহীত  

শুরুটা বিজ্ঞাপন দিয়ে হলেও পরবর্তীতে তিনি একের পর এক সাহসী ও দৃষ্টান্তমূলক চলচ্চিত্রের প্রযোজক হয়ে ওঠেন।
তার প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের পরিচালনায় ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে কঠিন বাস্তবতা ও অন্ধকারের এক স্নিগ্ধ উপস্থাপন ছিল ছবির উপজীব্য। চলচ্চিত্রটি জেতে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালক ও সেরা অভিনেতার পুরস্কার। এরপর দেশ-বিদেশের অনেক উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে স্বীকৃতি পায় মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০১৯-এ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের। প্রযোজক হিসেবে বাবুর মুনশিয়ানার আরও একটি সনদ ছিল এই স্বীকৃতি।

এরপরই আসে সেই যুগান্তকারী ছবি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। ২০২১ সালে কান উৎসবে নির্বাচিত হওয়া এই ছবিটি কেবল বাবুর ক্যারিয়ারের মোড়ই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসও। ছবিটি ভালেন্সিয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্র, হংকং এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভালে নিউ ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড, এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডে জুরি গ্র্যান্ড প্রাইজ সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করে।
 
এহসানুল হক বাবুর ভাষ্যে, ‘অনেকেই হয়তো মনে করেন আমরা অনেক অর্থ বিনিয়োগ পেয়ে এই ছবিটা বানিয়েছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ছবি করতে গিয়ে আমার ব্যক্তিগত জিনিসত্রও বিক্রি করতে হয়েছে, শুধুমাত্র চলচ্চিত্রের প্রতি আবেগের জায়গা থেকে এভাবে কাজ করেছি’। এসবের বাইরেও জড়িয়ে আছে আরো হাজারো গল্প। 

এহসানুল হক বাবু। ছবি: সংগৃহীত

এহসানুল হক বাবুর ক্যারিয়ারে একটি বিশাল অংশজুড়ে আছে বিজ্ঞাপনচিত্র। গত ১৩ বছরে প্রযোজনা করেছেন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ৩০ টির অধিক ব্র্যান্ডের জন্য ৫০০টির বেশি বিজ্ঞাপন ও কর্পোরেট ভিডিও। বিশেষ করে তার প্রযোজিত জীবনীভিত্তিক বিজ্ঞাপনগুলো, তারামন বিবির জীবনী, সৈয়দ আব্দুল আলিম এর জীবনী, ৫২ এর ভাষার গান ইত্যাদি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দেশপ্রেমকে জনপ্রিয় মাধ্যমে তুলে ধরার এক অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জীবনীভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন’ ও ‘শহীদ মুয়াজ্জেম হোসেন’ এর নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন সরকারি মহলেও। ‘প্রতিটি কাজই আমার জন্য বিশেষ, প্রত্যেকটি কাজেই সবসময় নিজের সর্বোচ্চটা দিতে চেয়েছি’, যোগ করেন বাবু। 

শুধু চলচ্চিত্র কিংবা বিজ্ঞাপনের বাইরে নাটকেও আছে এহসানের পথচলা, যেখানে তিনি নতুন নির্মাতাদের পাশে থেকে গড়ে তুলেছেন ভবিষ্যৎ গল্পকারদের। 

পরিশ্রম আর স্বপ্নকে সাথে নিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করেছেন দেশ-বিদেশে। চার বছর আগে কানে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল রেহানা মরিয়ম নূর দিয়ে, তার পরতে পরতে ছিল এহসানুল হক বাবুর নিরব কিন্তু দৃঢ় নেতৃত্ব। চার বছর পরেও তিনি থামেননি। সিনেমার প্রতি দায়বদ্ধতা, গল্পের প্রতি শ্রদ্ধা, আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসা তাকে আগামীর পথচলায় আরও অনুপ্রাণিত করছে। পর্দার পেছনের মানুষও ইতিহাস রচনা করতে পারেন, এটিই প্রমাণ করে যাচ্ছেন বারবার।

কান চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেটে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ টিমের সঙ্গে প্রযোজক এহসানুল হক বাবু। ছবি: সংগৃহীত

শুধু প্রযোজক হিসেবে নন, স্টুডিও, ক্যামেরা ইত্যাদি চলচ্চিত্রমুখী উন্নয়ন সম্পর্কিত নানান ব্যবসার সাথেও জড়িত আছেন বাবু।
চার বছর আগে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর মধ্য দিয়ে, সেই পথচলা থেমে থাকেনি। এখনো চলমান রয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র প্রজেক্টের প্রস্তুতি। 

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এ প্রযোজক বলেন, ‘বর্তমানেও বেশ কয়েকটি প্রজেক্টের কাজ চলছে। কাজগুলো প্রস্তুত হলেই সেগুলো আন্তর্জাতিক নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। দিনশেষে আমার একটাই লক্ষ্য, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে একটি নতুন বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরা, যেখানে দেশের পতাকা সগৌরবে উড়বে গল্পের পর্দায়।’

ইত্তেফাক/এসএ