নীলফামারীতে সারের কৃত্রিম সংকট, ১ হাজার ৫০ টাকার সার ১৭শ টাকায় বিক্রি

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৫, ২০:০৩

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় বিসিআইসি ডিলারদের বিরুদ্ধে ডিএপি (ড্যাপ)ফসফেট সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকার নির্ধারিত মূল্যেও চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। 

কিছু কিছু ডিলার এক হাজার ৫০ টাকার ড্যাপ সার ১২শ থেকে ১৩১০ টাকায় বিক্রি করছেন। কৃষকরা জানিয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা ডিলারের কাছ থেকে সার কিনতে না পেরে ৫০ কেজি ড্যাপ সার প্রতি-বস্তা খুচরা বাজারে ১৪শ থেকে ১৭শ টাকা দামে  কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে চলতি মৌসুমে  আমন আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক।

অভিযোগ ও সরেজমিনে কৃষকদের কাছ থেকে জানা গেছে বিসিআইসি ডিলারদের গোডাউনে  পর্যাপ্ত পরিমাণে ড্যাপ সার মজুদ রয়েছে। তারপরও ডিলাররা কৃষকদের কাছে ড্যাপ সার মজুদ থাকার বিষয় অস্বীকার করছেন। তবে যে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী  অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার কিনছেন তাঁদেরকে ম্যামো না দিয়ে ছোট্ট একটি টোকেন ধরিয়ে দিচ্ছেন ডিলাররা। 

গত বুধবার উপজেলা মোড়ে দিয়ে দেখা যায় সাইদুল ইসলাম নামে এক ভ্যান চালক ভ্যানে করে ১৩ বস্তা সার নিয়ে যাচ্ছেন।  সার কোন ডিলারের কাছ থেকে নিয়ে আসলেন ওই ভ্যান চালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রজব ট্রেডার্স থেকে ওই সার তিনি নিয়ে যাচ্ছেন পুটিমারী ইউনিয়নের এক খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে। এসময় ভ্যান চালকের কাছে সারের ম্যামো চাইলে তিনি বলেন ম্যামো ছাড়াই সার দিয়েছে। তবে ভ্যান চালক বলেন আপনারা চাইলে ম্যামো আনতে পারি। ওই ভ্যানে দেখা যায় মোট ১৩ বস্তা সার রয়েছে এর মধ্যে ১০ বস্তা ইউরিয়া ও ৩ বস্তা এমওপি পটাস। ড্যাপ সার নাই কেন প্রশ্ন করলে ওই সারের মালিক বলেন, গোডাউনে ডিএপি (ড্যাপ) সার নাই তাছাড়া দাম বেশি তাই কিনিনি। 

গোডাউনে ড্যাপ সার নেই এমন সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষনিক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলমকে বিষয়টি অবগত করলে তিনি অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মোঃ ইয়াকুব আলী, উপজেলা উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুর রহমান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লিয়াকত আলীসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিসিআইসি ডিলার রজব ট্রের্ডাসের গোডাউনে পাঠিয়ে দেন। এসময় ওই কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সাথে নিয়ে  গোডাউন পরিদর্শকালে ইউরিয়া এমওপি পটাসসহ অন্যান্য সার মজুদ পেলেও ডিএপি সার পায়নি। পরে পিছনের গোডাউনে গিয়ে দেখা যায়,পর্যাপ্ত পরিমাণে ড্যাপ সার মজুদ রয়েছে। 

সামনের গোডাউনে ইউরিয়া, এমওপিসহ অন্যান্য সার রয়েছে কিন্তু ড্যাপ নাই কেন, এ বিষয়ে রজব ট্রেডার্সের মালিক ও বিসিআইসি ডিলার আতিকুর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, সামনের গোডাউনে জায়গা নেই তাই পিছনে রেখেছি। ইউরিয়া পিছনে রেখে সামনে ড্যাপ রাখলেন না কেন প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। 

আমন মৌসুমে যে সারের চাহিদা বেশি সে সার পিছনের গোডাউনে কেন, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা ইয়াকুব আলীকে এমন প্রশ্ন করলে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন নীতিমালার কথা জানিয়ে অফিসে ফিরে যান। 

পুটিমারী ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের চাষি ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমি তিনবিঘা জমি ২৫ হাজার টাকায় চুক্তি নিয়ে চায়না জাতের আমন ধান চাষ করেছি। ধান রোপণের এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জমিতে অবশ্যই ডিএপি এবং ইউরিয়া সার দিতে হবে। প্রতিবিঘা জমিতে সরকারী হিসাব অনুযায়ী ১০ কেজি ড্যাপ, ১০ কেজি ইউরিয়া দিতে হয়। কিন্তু আমি ১৫ কেজি করে ড্যাপ ও ইউরিয়া দিয়েছি। 
উপজেলা মোড়ের খুচরা ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম আমার কাছ থেকে প্রতি কেজি ড্যাপ ২৮ টাকা করে কেজি নিয়েছে। সরকারী মূল্য যেখানে ২১ টাকা। কি করব বাধ্য হয়ে নিতে হয়েছে। 

কৃষকের কাছ থেকে ড্যাপের কেজি ২৮ টাকা নিয়েছেন কেন, খুচরা ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ডিলার আমাদের কাছ থেকে ২৫ টাকা ২৬টাকা কেজি কেজি হিসাবে নেয়। আমরা ২৮ টাকা বিক্রি করি।

কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কেশবা তেলিপাড়া গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান বলেন, আমি এক বিঘা জমিতে চায়না জাতের ধান রোপণ করেছি। জমিতে সার দিতে হবে।   উপজেলা মোড়ের খুচরা ব্যবসায়ী মাহুবার রহমানের কাছে ডিএপি সার কিনতে গেলে সে আমার কাছে ৩৪ টাকা কেজি নেয়। সে হিসাবে ৫০ কেজির ডিএপির বস্তা দাঁড়ায় ১৭শ টাকা। 

বাহাগিলি ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের জয়নন কোর্ট গ্রামের কৃষক ছপিল মিয়া বলেন, আমি বাহাগিলি ইউনিয়নের ডিলার মেসার্স রণজিৎ কুমার ট্রেডার্সে গিয়ে গত ১২ তারিখে দুই বস্তা ডিএপি সার কিনি সে আমার কাছে প্রতিবস্তা ডিএপি সার  ১৩শ ১০ টাকা বস্তা হিসাবে নিয়েছে। সার কেনার সময় মেমো নিয়েছিন কিনা জানতে চাইলে ওই কৃষক বলেন, আমাকে শুধু একটা স্লিপ ধরিয়ে দিয়েছে সেখানে শুধু সারের বস্তার পরিমাণ লেখা থাকে। দাম লেখা থাকেনা।

মাগুড়া ইউনিয়নের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন, বড়ভিটা ইউনিয়নের কৃষক আনোয়ার হোসেন, রণচণ্ডী ইউনিয়নের কৃষক হেলাল মিয়াসহ একাধিক কৃষক ডিএপি সার বস্তায় তিন থেকে ৬শ টাকা বেশি নেয়ার অভিযোগ করেন। 

বিসিআইসি ডিলার রণজিৎ কুমার কুণ্ড ট্রের্ডাসের মালিক রাজিব কুমার কুণ্ডের সাথে কথা বললে তিনি অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, কিশোরগঞ্জ উপজেলায়  এবার ১৫ হাজার ৯শত দুই হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।  সে অনুযায়ী বরাদ্দ পর্যাপ্ত রয়েছে সারের কোন সংকট নেই। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বেশি নিলে আইন অনুযায়ী বিসিআইসি ডিলারসহ সবার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

ইত্তেফাক/এএইচপি