ঘরের মাঠে হওয়া সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ নারী দল এখনো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন এ হোটেলেই রাখা হয়েছিল আফঈদা খন্দকার, তৃষ্ণা, সাগরিকাদের। এই দলটা ১২ দিন পর লাওস যাবে, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে। লাওসে এএফসির বাছাইয়ের খেলা রয়েছে। অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরদিনই খেলোয়াড়দের ফুটবল ভবনে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল সেটি থামিয়ে হোটেলেই রাখার ব্যবস্থা করেছেন।
১২ দিনের জন্য ফুটবল ক্যাম্পটার স্থান পরিবর্তন না করার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন তাবিথ আউয়াল। তিনি মনে করেছেন ১২ দিন পাঁচ তারকা হোটেলে থাকলে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। এটা আরও ভালো হবে। চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসার পর খেলোয়াড়দের মধ্যে যে স্পিরিট রয়েছে সেটা নষ্ট হতে পারে নানা কারণে। পাঁচ তারকা হোটেলের আবাসন, খাবার-দাবার, সুইমিংপুল, জিম সবকিছু হাতের নাগালে। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা থাকছেই, যেটা ফুটবল ভবনে নেই। এক জায়গায় ক্যাম্প থাকলে প্রস্তুতিতে ছেদ পড়বে না। লাওসে গিয়ে যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারে তাহলে এশিয়ান কাপ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে খেলবে বাংলাদেশ। সেটি হবে নারী ফুটবল দলের জন্য আরেকটি সাফল্য।
পাঁচ দিন হতে চললো নারী ফুটবলাররা হোটেলে ক্যাম্প করছেন। কিন্তু বাফুফে হতে কেউ নাকি হোটেলে গিয়ে খোঁজ খবরও নেননি। অবশেষে গতকাল খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা করতে বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল নিজেই হোটেলে গিয়েছিলেন। খেলোয়াড়রা কেমন আছেন, কী করছেন। এ সব কিছু সরেজমিনে দেখতে গতকাল সকালে হোটেলে গিয়েছিলেন তিনি। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দোতলায় ফুটবলারদের সঙ্গে বসেন তাবিথ। সভাপতিকে পেয়ে খেলোয়াড়রা যেন কথার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। কার কী সমস্যা, একে একে সব কথা তুলে ধরেছেন সভাপতির কাছে।
তাবিথ আউয়াল সব খেলোয়াড়কে কথা বলার ফ্লোর দিয়েছেন। কিন্তু সবাই কথা না বললেও, কে কার আগে কথা বলবেন সেটি নিয়ে একরকম প্রতিযোগিতাই দেখলেন বাফুফে বস। নানা ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। উত্থাপতি সমস্যার সমাধান চেয়েছেন খেলোয়াড়রা। তবে চাওয়ার মধ্যে দাম্ভিকতা নেই। দাবি পূরণ করতে হবে, না হলে খেলবো না। এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ পাননি খেলোয়াড়দের মধ্যে। খেলোয়াড়রা তাদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগত সমস্যাও ছিল এর মধ্যে। নারী দলের ক্যাম্পে যারা রয়েছেন তারা সবাই গ্রামের মেয়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়ে। তারা ঢাকায় ফুটবল খেলেন। কিন্তু বাবা-মা খেলা দেখতেও আসতে পারেন না। নানা কথা তুলে ধরা হয়েছে।
মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বের বাছাইয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অথচ এই দলটা নানাভাবে সমস্যা মোকাবিলা করেছে। নারী ফুটবলারদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে। মেয়েরা সমস্যার কথা বলেছেন কিনা, জানতে চাইলে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এড়িয়ে গেছেন। ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, তিনি সবার কথা শুনেছেন। তাবিথ বলেন, 'সব কথা বাইরে বলা যাবে না।' সমস্যা শুনেছেন, সেটিও তিনি মেনে নিয়েছেন। সমস্যা সমাধান করা হবে, সামর্থ্যের মধ্যে সবই সমাধান করা হবে বলে জানিয়েছেন।
ফুটবল দলের অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, তারা অনেক ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। সেগুলো কী? মিয়ানমার সফরে বাফুফে থেকে দেওয়া খেলোয়াড়দের কেডস ছিল নিম্নমানের। গতকাল বাফুফে সভাপতির কাছে খেলোয়াড়রা নাকি দাবি করেছেন তাদের নতুন কেডস খুলে গিয়েছিল। ফুটবল দলের সবাই একই রঙের, একই ডিজাইনের কেডস পরবে, এটাই একটা দলের সৌন্দর্য। কিন্তু হয়েছিল তার উলটো। নানা রঙের কেডস দেওয়া হয়। এসব কথা শুনে হোটেলে বসেই এপেক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ফুটবলারের জন্য কেডস আনার ব্যবস্থা করেছেন।
আরেকটি সূত্রের দাবি ফুটবল দলে প্র্যাকটিসের জন্য কয়েক সেট জার্সি রাখা হয়। কিন্তু মিয়ানমারে নারী দলের প্র্যাকটিসের জন্য জার্সি ছিল এক সেট। অনুশীলন করে হোটেলে ফিরে নিজেরাই ঘামে ভিজে যাওয়া জার্সি ধুয়ে পরের দিনের অনুশীলনের জন্য শুকিয়েছেন। এসব কথা শুনে তাবিথের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন হোটেল লবিতে। কেন এ ধরনের সমস্যা হলো তার কাছেও জানতে চেয়েছেন। পিটার কেন সমস্যাগুলো মেনে নিয়েছেন সেটি নিয়েও প্রশ্ন ছিল তাবিথের। কোচিং স্টাফদের কাছেও তার একই প্রশ্ন।
কেডস খুলে যাবে, জার্সি মাত্র একসেট, এসব কেন হবে। বৈঠকে বসে তাবিথ সব মেয়েদের কথা বলার অনুরোধ করেছেন। কোনো জড়তা না রেখে কথা বলতে সুযোগ করে দিয়েছেন। মেয়েরা আরও কিছু প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেছেন, তাবিথ এসব শুনে হতবাক হননি। মেয়েদের প্রয়োজন, তাই সাহস করে প্রকাশ করেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তাদের মা-বাবা ঢাকায় আসতে পারেন না। আন্তর্জাতিক ফুটবল হলে খেলোয়াড়দের বাবা-মা যদি ঢাকায় এসে খেলা দেখতে চায়, থাকার জায়গা নেই। আবাসন সংকট রয়েছে। গতকাল এই সমস্যাটার কথা খুব জোর দিয়ে উঠানো হয়েছে। তাবিথ আউয়াল জানিয়েছেন, 'এখন আর বাফুফে ভবনে খেলোয়াড়দের ক্যাম্প সংকুলান হয় না। সত্যিকার অর্থে আবাসন সমস্যার সমাধান করতে হলে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন, যদি নতুন করে আবাসন ভবন নির্মাণ করতে হয়, সেটি কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। তবে অনেক ধাপ পার হতে হবে। আমরা চিন্তা করছি মেয়েদের আরও সুন্দরভাবে রাখা যায় কীভাবে। বাবা-মা ঢাকায় এসে খেলা দেখতে চাইলে তাদের ঢাকায় আবাসন ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এটা আমরাও উপলব্ধি করছি। চেষ্টা করছি কিছু করা যায় কিনা।'
