দীর্ঘ ১৬০ দিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) আবারও প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরেছে। মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। ভোর থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে আগমনে ছিল অন্যরকম এক প্রাণের স্পন্দন।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রেণিকক্ষে ফেরার অনুভূতি অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই আবেগঘন ছিল। ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল আনন্দ, স্বস্তি আর প্রত্যাশার ছাপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আসলাম হোসেন বলেন, ক্লাস শুরুর খবরে আগের দিনই খুলনায় চলে এসেছি। অনেকদিন পর সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগছে। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় অনেকে বাসা ছেড়ে দিয়েছিল, এখন আবার নতুন করে রুম ভাড়া নিচ্ছে।
১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী তানিম আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে—এটাই সবচেয়ে বড় সুখবর। যদিও প্রথম দিন সব কিছু স্বাভাবিক হবে না, তবে ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। শিক্ষকদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ, কারণ তারাও ফিরে এসেছেন শ্রেণিকক্ষে।
২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী দীপ্ত বলেন, পাঁচ মাস পর ক্লাস শুরু হওয়া আমাদের জন্য বড় একটা স্বস্তির খবর। আমরা ইতিমধ্যেই এক সেমিস্টার পিছিয়ে পড়েছি। তবে নতুন ভিসি দায়িত্ব নিয়েছেন, আশা করছি কার্যক্রম নিয়মিত হবে।”
ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আম্মান বলেন, “আজকের দিনটা আমার কাছে স্পেশাল। স্কুল জীবনের মতো প্রথম ক্লাসের অনুভূতি ফিরে পেয়েছি।
কুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ফারুক হোসেন বলেন, নবনিযুক্ত উপাচার্যের আশ্বাসে আন্দোলন তিন সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরেছেন, শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত।
কুয়েটের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালী মঙ্গলবার বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তিনি বলেন, সবার সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ধরে রাখতে চাই। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে কাজ করব।
গত ২৪ জুলাই তাকে কুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরদিন সন্ধ্যায় তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর শিক্ষক, কর্মকর্তা, ছাত্র প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা তৎকালীন উপাচার্য, প্রো-ভিসি ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের অপসারণ দাবি করে আন্দোলন শুরু করে। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যকে অপসারণ করে। বিকল্প ভিসি নিয়োগের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি, কারণ তখন শিক্ষক সমিতি লাঞ্ছনার ঘটনার বিচার দাবিতে কর্মবিরতিতে যায়।
সবশেষ ২৪ জুলাই নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর অবরুদ্ধ পরিস্থিতি কাটে এবং মঙ্গলবার থেকে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়।বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার থেকেই শিক্ষার্থীরা খুলনায় ফিরতে শুরু করে। যদিও বৃষ্টির কারণে প্রথম দিন অনেকে উপস্থিত হতে পারেননি, তবু যারা এসেছেন, তারা ফিরে পেয়েছেন হারানো ক্লাসঘরের গন্ধ, প্রিয় মুখগুলোর হাসি—একটি স্বাভাবিক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিচ্ছবি।

