বেশ কয়েকদিন ধরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় সংলগ্ন পেছনের পকেট গেট বন্ধ রয়েছে। এতে কেরানীগঞ্জ ও এর আশপাশ এলাকা থেকে খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে আসা শত শত রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
জানা গেছে, গত ৯ জুলাই পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনে মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে জনসম্মুখে পিটিয়ে ও পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করে হাসপাতালের নিরাপত্তার স্বার্থে নদীর পাড় সংলগ্ন পেছনের গেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তখন থেকেই গেটটি বন্ধ রয়েছে।
বুধবার (৩০ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, আগানগর ব্রিজ ঘাট, বটতলা ঘাট, জিনজিরা ফেরি ঘাটসহ আশপাশের নৌঘাট থেকে বহু রোগী ও তাদের স্বজনরা নৌকায় নদী পার হয়ে হাসপাতাল ঘাটে পৌঁছাচ্ছেন। তবে ঘাট সংলগ্ন গেটটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ থাকায় কেউ সরাসরি হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করতে পারছেন না। সেজন্য ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন অনেকে। কেউ কেউ অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে বাধ্য হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বা রিকশায় চেপে প্রায় সড়ে তিনশ মিটার সড়ক ঘুরে হাসপাতালের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন। সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রিকশা চালকরা ২০ টাকার ভাড়া নিচ্ছেন ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
খেয়া নৌকার মাঝি আবুল হোসেন (৬৮) গত ৪০ বছর ধরে বটতলা ঘাট থেকে মিটফোর্ড ইমার্জেন্সি ঘাটে নৌকা চালিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে হাসপাতালের এই গেট কোনোদিন বন্ধ হতে দেখিনি। চলতি সপ্তাহের শনিবার সাপে কাটা এক রোগীকে বটতলা ঘাট দিয়ে নৌকায় করে হাসপাতাল ঘাটে নিয়ে আসি। গেট বন্ধ থাকায় তারা দেয়াল টপকে হাসপাতালের ভেতরে গিয়েছিল। আমি নিজে রোগীকে দেয়াল টপকাতে সাহায্য করেছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিটফোর্ড ইমার্জেন্সি ঘাটে প্লাস্টিকের মালামাল বিক্রেতা জানান, গত বৃহস্পতিবার দেড় বছরের এক শিশু পানিতে ডুবে যায়। পরে ওই শিশুটিকে উদ্ধার করে স্বজনরা এই ঘাট হয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখে গেট বন্ধ। তারা আসলে জানতো না এই গেটটি বেশ কয়েকদিন ধরে বন্ধ। শিশুটি জরুরি অবস্থার রোগী ছিল, তাই আমরা শিশুটিকে কোলে নিয়ে গেটের পাশের দেয়াল টপকে হাসপাতালে প্রবেশ করতে সহায়তা করি।
কেরানীগঞ্জের তেলঘাট থেকে মর্জিনা বেগম তার নাতি মিরাজকে নিয়ে নদী পার হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। গেট বন্ধ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি ডায়াবেটিসের রোগী। নৌকায় করে পার হয়ে এসেছি। এসে দেখি গেট বন্ধ। দাঁড়িয়ে থেকে শরীর আরও খারাপ লাগছে। এভাবে রোগীদের কষ্ট দিয়ে হাসপাতাল চলে কীভাবে? বাবুবাজার ব্রিজের ওপর যানজটের কারণে আমরা এই ঘাট হয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করতাম এখন দেখি সেটাও বন্ধ।
একই ধরনের দুর্ভোগে পড়েছেন মো. ইমরান শেখ (৩৬)। তিনি তার বৃদ্ধ বাবাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, বাবা হাঁটতে পারেন না। অনেক কষ্ট করে নৌকায় করে আনলাম। কিন্তু গেট বন্ধ দেখে রিকশা খুঁজে অতিরিক্ত রাস্তা ঘুরে নিয়ে যেতে হলো। কর্তৃপক্ষ কি জানে না কত রোগী এই ঘাট দিয়ে আসে? জনগণের স্বার্থে দ্রুত গেটটি খুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ আলী হাবিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা জানেন কিছুদিন আগে হাসপাতালের অভ্যন্তরে একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর নিরাপত্তা বিবেচনায় নদী ঘেঁষা পেছনের ফটকটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কবে নাগাদ গেটটি আবার খোলা হবে, সে বিষয়ে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি পরিচালক ভালো বলতে পারবেন।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৯ জুলাই মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে লাল চাঁদকে হত্যা করেন একদল লোক। পিটিয়ে, ইটপাথরের খণ্ড দিয়ে আঘাত করে তাঁর মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করা হয়। তার শরীরের ওপর ওঠে হত্যাকারীদের লাফাতে দেখা যায় সিসিটিভি ক্যামেরার (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজে। প্রকাশ্যে সোহাগকে হত্যার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালের পর এ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
